এনএনবি : রমজান শুরু হওয়ার প্রায় এক মাস বাকি থাকলেও ঢাকায় ছোলা, খেজুর ও সয়াবিন তেলের দাম ইতোমধ্যে বেড়ে গেছে। ফলে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে হিমশিম খাওয়া নিম্ন ও সীমিত আয়ের মানুষের ওপর চাপ আরও বাড়ছে।
গত বছরের তুলনায় চলতি বছরে বাজার সিন্ডিকেট বেশ বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। তবে অসাধু ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেট ভেঙে বাজারে স্বস্তি ফেরাতে মাঠ পর্যায়ে ব্যাপক কার্যক্রম পরিচালনা করছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর।
কনজ্যুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি গোলাম রহমান গণমাধ্যমকে বলেন, বাজারে স্বস্তি ফেরাতে হলে পণ্য সরবরাহ বাড়াতে হবে। পাশাপাশি অসাধু ব্যবসায়ীদের চিহ্নিত করে তাদের সিন্ডিকেট সরকারকে ভাঙতে হবে। এছাড়াও পণ্যবাহী পরিবহন থেকে চাঁদাবাজি বন্ধে প্রশাসনের কঠোর ভূমিকা পালন করতে হবে। তাহলেই নিত্যপণ্যের বাজারে স্বস্তি ফিরে আসবে।
এদিকে বাজারের স্বস্তি ফেরানোকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর। সাড়ে ৩শ’র অধিক জনবল নিয়ে বাজার মনিটরিংসহ মাঠ পর্যায়ে বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে এই অধিদপ্তর। এরমধ্যে প্রধান কার্যালয়ে কর্মরত রয়েছেন ৭৩ জন। এছাড়াও বিভাগীয় কার্যালয়গুলোতে ১০১ জন এবং জেলা কার্যালয়ে ১৯২জন কর্মরত আছেন।
সর্বশেষ শনিবার কাপ্তান বাজার, যাত্রাবাড়ী কাচাবাজার ও মালিবাগ রেল লাইন ঘেঁষা কাঁচাবাজার ঘুরে দেখা যায়, কেজিপ্রতি ব্রয়লার মুরগি বিক্রি হচ্ছে ১৮০-২০০টাকা, লেয়ার মুরগি ৩১০, পাকিস্তানি কক মুরগি ৩২০, গরু মাংস পাওয়া যাচ্ছে ৫৮০-৭৫০ টাকায়। গত সপ্তাহের তুলনায় গরু ও মুরগির দাম কেজি প্রতি ২০-৫০টাকা কমেছে।
সবজির মধ্যে কেজিপ্রতি বেগুন ৫০ টাকা, টমেটো ৫০, ফুলকপি ৩০, পেপে ৪০, লাউ ৬০, কাঁচামরিচ ৮০, মুলা ৩০, মিস্টি কুমড়া ৪০, শিম ৪০, পাতাকপি ৪০, শালগম ৪০, চিচিংগা ৭০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। প্রতিটি সবজিতে কেজি প্রতি দাম কমেছে ১০-২০টাকা।
বাজারে আলুর দামের পাশাপাশি কমেছে পেঁয়াজের দাম। ৫ কেজি আলু বিক্রি হচ্ছে ১০০-১১০ টাকায় পেঁয়াজ কেজি প্রতি বিক্রি হচ্ছে ৯০-১১০ টাকায়। গত সপ্তাহের তুলনায় পেঁয়াজাও ও আলু কেজি প্রতি কমেছে ১০-২০টাকা। ডিম পাওয়া যাচ্ছে প্রতি ডজন ১২০-১৪০ টাকায়।
গত সপ্তাহের তুলনায় বেশ কিছু মাছের দামও কমেছে। টেংরা মাছের কেজি বিক্রি হচ্ছে গত সপ্তাহের দাম ৬৫০ টাকায়, পাবদা কেজিপ্রতি ২০ টাকা কমে হয়েছে ৩২০, তেলাপিয়া পাওয়া যাচ্ছে ১৮০-২০০, লাল পোয়া ৩০০-৩৫০, কৈ ২৪০, রুই কেজি প্রতি ২৫০, মাঝারি চিংড়ি পাওয়া যাচ্ছে ৬০০-৭৫০টাকায়। পাঙাস ১৮০, ঝাটকা ইলিশ ৬০০, শিং ৭০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। বেশিরভাগ মাছ গত সপ্তাহের তুলনায় কেজিপ্রতি ২০-৫০ টাকা কমে বিক্রি হচ্ছে।
কাপ্তান বাজারের ব্যবসায়ী ইয়ারুল ইসলাম বলেন, গত সপ্তাহের তুলনায় অনেক পণ্যের দাম কিছুটা কমেছে। বেশি দামে পণ্য কিনলে আমাদের বেশি দামেই বেচতে হয়। বাজারে অনেক পণ্যের সরবরাহ বেশি দেখা যাচ্ছে তাই অনেক জিনিস আমরা কমে কিনতে পারছি। তাই বিক্রিও কমে করতে পাড়ি।
বৃহস্পতিবার রাজধানীর মৌলভীবাজার ব্যবসায়ী সমিতির সঙ্গে আলোচনায় বাণিজ্য প্রতিমন্ত্রী আহসানুল ইসলাম টিটু বলেছেন, আমরা রমজান মাসে পণ্যের সরবরাহ ঠিক রাখতে কাজ করছি।’ কোনো মিল কিংবা পণ্য আমদানিকারক ইচ্ছাকৃতভাবে পণ্য সরবরাহ না করলে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অসাধু ব্যবসায়ীদের কারণে যেন অন্যদের কষ্ট না হয়।
একই অনুষ্ঠানে ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার্স অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এফবিসিসিআই) পরিচালক সিরাজুল ইসলাম বলেন, ব্যবসায়ীরা ব্যাংকের টাকা পরিশোধ করতে পারছে না। সুদের হার বেড়ে গেছে। ব্যাংক সুদের হার বাড়লে কোনোভাবেই পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে না।
তথ্য বলছে, চলতি বছরের জানুয়ারি মাসেই ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের বিভাগীয় ও জেলা কার্যালয়ের কর্মকর্তাদের নেতৃত্বে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন ২০০৯ অনুযায়ী দেশব্যাপী মোট ৭৭২টি বাজার ও বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে পরিচালিত ভোক্তা স্বার্থ বিরোধী বিভিন্ন অপরাধে ১ হাজার ৩২১টি প্রতিষ্ঠানকে আইনের আওতায় আনা হয়। এ সময় প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে মোট ২ কোটি ১৮ লাখ ৪৯ হাজার ৬০০ টাকা জরিমানা আদায় করে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর।
ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে ২০২২-২৩ অর্থবছরের শুধ বাজারেই অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে ১১ হাজার ৬৭০টি। এ সকল অভিযানে ২৫ হাজার ৬৪৫টি প্রতিষ্ঠানকে শাস্তির আওতায় আনা হয়েছে। জরিমানা আদায় করা হয়েছে ১৮ কোটি ৮৫ লাখ ৮০ হাজার ৮০০ টাকা।
এদিকে ২০২৩-২০২৪ চলতি অর্থবছরে বাজারে অভিযান হয়েছে ৬ হাজার ৯৬১টি, ১৫ হাজার ২৯৬টি প্রতিষ্ঠানকে শাস্তির আওতায় আনা হয়েছে। জরিমানা আদায় করা হয়েছে ১১ কোটি ১২লাখ ৯১ হাজার ৭০০ টাকা।
২০০৯-২০১০ থেকে ২০২৩-২০২৪ অর্থ বছর পর্যন্ত ১৪ বছরে সারাদেশের বাজারে ৭২ হাজার ৪৬৫টি অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। শাস্তির আওতায় আনা হয়েছে ১ লাখ ৬৯ হাজার ৯০১ প্রতিষ্ঠানকে। অভিযানের মাধ্যমে আদায়কৃত জরিমানার পরিমাণ ১১৮ কোটি ৮৪ লাখ ৭ হাজার ৮৪২ টাকা।
জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক (অভিযোগ শাখা) মুহাম্মদ হাসানুজ্জামান জানিয়েছেন, ২০২২-২০২৩ অর্থবছরে অধিদপ্তরটিতে অভিযোগ জমা পরেছিল ২৫ হাজার ৬০৫টি, জমা পড়া সকল অভিযোগই নিষ্পত্তি হয়েছে।
এদিকে ২০২৩-২০২৪ চলতি অর্থবছরে ১ জুলাই থেকে ৩১ জানুয়ারি ২০২৪ পর্যন্ত অধিদপ্তরে ২০২২-২৩ অর্থবছরের অবশিষ্ট ৬হাজার ৬৭টি অভিযোগসহ মোট অভিযোগ জমা পরেছে ২২ হাজার ২৫৫টি, এর মধ্যে ১৮ হাজার ১১৫টি অভিযোগ নিষ্পত্তি হয়েছে। অভিযোগ নিষ্পত্তির মাধ্যমে ২৭ লাখ ৯০ হাজার ১০০ টাকা জরিমানা আদায় করা হয়েছে। এই অর্থবছরে সর্বশেষ প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী অনিষ্পত্তি অভিযোগের সংখ্যা ৪ হাজার ১৪০টি।
২০০৯-২০১০ থেকে ২০২৩-২০২৪ অর্থ বছর পর্যন্ত ১৪ বছরে অভিযোগ জমা পড়েছে: ১,২১,০৯০টি, নিষ্পত্তি হয়েছে ১,১৬,৯৫০টি, অনিষ্পন্ন ৪,১৪০টি। অভিযোগ নিষ্পত্তির মাধ্যমে ৬ কোটি ৩৩ লাখ ১৯ হাজার ৯০৮ টাকা জরিমানা আদায় করা হয়েছে।
ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন, ২০০৯ এর মাধ্যমে ২০০৯ সালের ২৪ জুন জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর প্রতিষ্ঠা হয়। একই আইনের অধীনে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ ও প্রতিষ্ঠা হয়। ২০১০-২০১৩ পঞ্জিকা বছর থেকে ২০২৩-২০২৪ অর্থ বছর পর্যন্ত ১৪ বছরে এই অধিদপ্তরটিতে মোট অভিযোগ জমা পড়েছে ১ লাখ ২১ হাজার ৯০টি, এরমধ্যে অভিযোগ নিষ্পত্তি হয়েছে ১ লাখ ৬৯ হাজার ৫০টি। এই ১৪ বছরে অভিযোগ নিস্পত্তির মাধ্যমে ৬ কোটি ৩৩ লাখ ১৯ হাজার ৯০৮ টাকা জরিমানা আদায় করা হয়েছে।
এদিকে, দেশের অধিকাংশ মানুষই ভোক্তা অধিকার আইন না জানায় প্রতারিত হচ্ছেন। প্রতিটি মানষেরই ‘ভোক্তা অধিকার’ রয়েছে। কিন্তু ভোক্তার অধিকার কী, কীভাবে একজন ভোক্তা প্রতারিত হলে প্রতিকার পাবেন, কোথায় যেতে হবে, কী করতে হবে এই বিষয়গুলো এখনো অনেকেরই অজানা। এতে করে প্রতিনিয়তই ক্রেতা বা ভোক্তারা নিজেদের অজান্তেও ঠকছেন। পণ্যের নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি মূল্য আদায়, ভেজাল পণ্য বিক্রি, মানহীন, মেয়াদোত্তীর্ণ ও নকল পণ্য প্রদানসহ বিভিন্ন উপায়ে ভোক্তাদের সঙ্গে প্রতারণা করে অসাধু ব্যবসায়ীরা। তবে এসব বিষয় থেকে প্রতিকার পেতে রয়েছে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের ‘ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন-২০০৯। এই আইনে কোনো ক্রেতা বা ভোক্তা ঠকানোর অভিযোগ প্রমাণিত হলে বিক্রেতার জেল-জরিমানা হওয়ার বিধান রয়েছে।
এদিকে জনগণকে ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ আইন-২০০৯ সম্পর্কে সচেতন করার লক্ষ্যে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর প্রচার ও জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম হিসেবে ইতোমধ্যেই ৪৪ লাখ ১৭ হাজার পোস্টার, লিফলেট ও প্যাম্পলেট ভোক্তাদের মধ্যে বিতরণ করা হয়েছে এবং বিতরণ কার্যক্রম এখনও অব্যাহত রয়েছে।
