এনএনবি : কোনো কারণ ছাড়াই দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি এখন নিয়মিত ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে যৌক্তিক কারণ থাকলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে দাম বাড়ে সিন্ডিকেটের কারণে।
চলতি বছর সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের এক বিশ্লেষণে দেখা যায়, বাংলাদেশে পণ্যের উচ্চমূল্য শুধু বাহ্যিক বা আন্তর্জাতিক বাজারের কারণেই নয়। এর পেছনে আছে প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশের অভাব, বাজারের সিন্ডিকেট, প্রয়োজনীয় মনিটরিংয়ের অভাব ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বিদ্যমান আইনের যথাযথ প্রয়োগ না থাকা।
বিশ্লেষকরা বলছেন, বাজারে এসব অপরাধ প্রতিরোধে আইনের বড় দুর্বলতা রয়েছে, যা আছে, তারও প্রয়োগ কম। আবার কিছু অপরাধের ক্ষেত্রে ‘গুরু পাপে লঘু দণ্ড’ নির্ধারিত রয়েছে। যে কারণে বারবার বেপরোয়া হয়ে উঠছেন ব্যবসায়ীরা। সিন্ডিকেটের মাধ্যমে লুটে নিচ্ছেন অবৈধ মুনাফা, যার মাশুল গুনতে হচ্ছে সাধারণ ভোক্তাদের।
বর্তমান আইনে কারসাজি করে কোনো পণ্য বেশি দামে বিক্রি করা ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন, ২০০৯-এর সরাসরি লঙ্ঘন। ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ, ভোক্তা অধিকারবিরোধী কার্য প্রতিরোধে এ আইন প্রণয়ন করা হয়েছিল। আইনের ২(২০)(ক) ধারা অনুযায়ী, কোনো আইন বা বিধির অধীন নির্ধারিত মূল্য অপেক্ষা বেশি মূল্যে কোনো পণ্য, ওষুধ বা সেবা বিক্রি করা বা করতে প্রস্তাব করা একটি দণ্ডনীয় অপরাধ।
ধারা ৪০ অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি কোনো আইন বা বিধির অধীন নির্ধারিত মূল্য অপেক্ষা বেশি মূল্যে কোনো পণ্য, ওষুধ বা সেবা বিক্রি বা বিক্রির প্রস্তাব করলে তিনি অনূর্ধ্ব এক বছরের কারাদণ্ড, বা অনধিক ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড, বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন। অর্থাৎ, যারা বাজারের নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে অতিরিক্ত মূল্যে কোনো পণ্য বিক্রি করবেন, তারা আইনত দণ্ডনীয় হবেন।
কিন্তু তথ্য বলছে, বাজার তদারকিতে ভোক্তা অধিকার আইনের আওতায় তৎপরতা সবচেয়ে বেশি হলেও দেশে এ আইনে বিচার শেষে সাজা হয়েছে, এমন উদাহরণ নেই। বাজারে কোনো পণ্য অধিক দামে বিক্রির প্রমাণ মিললে এক-দুই হাজার টাকা জরিমানা করে ছেড়ে দেওয়া হয়। ওই পরিমাণ জরিমানা অধিকাংশ ক্ষেত্রে ব্যবসায়ীর কিছু সময়ের অবৈধ মুনাফার সমান। এছাড়া আইনের অন্য ধারারও তেমন প্রয়োগ নেই।
এ পরিস্থিতিতে প্রচলিত ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন সংশোধন ও সময়োপযোগী করার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার- এমনটাই জানিয়েছেন বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি। সম্প্রতি তিনি গণমাধ্যমকে বলেন, ‘সিন্ডিকেটগুলো সব সময় বাজারে কারসাজি করে মূল্যবৃদ্ধির সুযোগ খোঁজে। এসব অবৈধ কারবারি চিহ্নিত করে শাস্তির আওতায় আনতে আমরাও সদা সক্রিয়। সেজন্য এ আইন অনেক ক্ষেত্রে যথার্থ নয়। আইন সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।’
ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইনে অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের বাজার তদারকির ক্ষমতা থাকলেও তাদের বিচারিক ক্ষমতা নেই। অর্থাৎ, শুধু জরিমানা করতে পারে।
এ আইনের ২৪ ধারা অনুযায়ী, মহাপরিচালক বা সরকারের কাছ থেকে এই উদ্দেশ্যে ক্ষমতাপ্রাপ্ত কোনো কর্মকর্তা যদি মনে করেন কোনো ব্যক্তি এই আইনের অধীন কোনো অপরাধ করেছেন, তাহলে সেই ব্যক্তির বিরুদ্ধে পরোয়ানা জারি করতে পারে। সেজন্য মাঝে-মধ্যে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে অভিযান পরিচালনা ও জরিমানা করা ছাড়া ভোক্তা অধিকারের তেমন কোনো পদক্ষেপ দেখা যায় না।
কারসাজি বা সিন্ডিকেট করে কেউ যাতে অতিরিক্ত মুনাফা অর্জন করতে না পারে, সেজন্য প্রতিযোগিতা আইন-২০১২ প্রণয়ন করা হয়। এই আইনের মূল উদ্দেশ্য ছিল, ব্যবসা-বাণিজ্যে সুস্থ প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ নিশ্চিত করা। প্রতিযোগিতা আইনের ১৫ ধারা অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান কোনো পণ্যের উৎপাদন, সরবরাহ ও বিতরণ সংক্রান্ত এমন কোনো চুক্তিতে আবদ্ধ হতে পারবে না, যা বাজারে সেই পণ্যের দাম নির্ধারণ বা প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রে বিরূপ প্রভাব বিস্তার করে বা বিস্তারের কারণ ঘটায় কিংবা বাজারে মনোপলি অথবা ওলিগপলি অবস্থার সৃষ্টি করে।
১৬ ধারা অনুযায়ী, ‘প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে পণ্য বেচাকেনা বা সেবা প্রদানে অন্যায্য বা বৈষম্যমূলক শর্তারোপ করে বা পণ্য ও সেবার কেনাবেচায় বৈষম্যমূলক মূল্য বা কৃত্রিমভাবে হ্রাসকৃত মূল্য নির্ধারণ করে, এমন কোনো কর্তৃত্বময় অবস্থার সৃষ্টি করা যাবে না।’ এই আইনের ২০ ধারা অনুযায়ী অভিযুক্তকে আর্থিক জরিমানার বিধান রয়েছে।
তবে এ আইনের এখনো কোনো সুফল পাওয়া যায়নি। যদিও গত অক্টোবরে ব্রয়লার মুরগির দাম অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধিসংক্রান্ত মামলায় দুটি প্রতিষ্ঠানকে প্রায় সাড়ে আট কোটি টাকা জরিমানা করে বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা কমিশন। প্রতিযোগিতা আইনের ১৫ ধারায় এই দুই প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়। তবে কোম্পানিগুলো রায়ের বিরুদ্ধে আপিল আবেদন করেছে।
দেশের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা প্রায়ই অভিযোগ করেন, বড় ব্যবসায়ী বা করপোরেট প্রতিষ্ঠাগুলো বাজারে একচেটিয়া অবস্থানের কারণে পণ্যের দাম বাড়ছে। কোম্পানিগুলো প্রচলিত প্রতিযোগিতা আইন লঙ্ঘন করে বাজারে কর্তৃত্বমূলক অবস্থা বজায় রেখে কৃত্রিমভাবে দাম বাড়িয়ে যাচ্ছে। প্রতিযোগিতা কমিশন এসব বিষয়ে কোনো ব্যবস্থা নেয় না বলে অভিযোগ। এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন ভোক্তারাও। তারা বলছেন, আইনের যথাযথ প্রয়োগ না থাকায় এই সিন্ডিকেট আরও শক্তিশালী হচ্ছে।
বিশেষ ক্ষমতা আইনে সিন্ডিকেট ও মজুতকারীদের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড, এমনকি যাবজ্জীবন এবং সর্বনিম্ন ১৪ বছরের সাজা থাকার পরও কোনো ধরনের পদক্ষেপ চোখে পড়ছে না। ১৯৭৪ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইনে অবৈধ মজুত ও কালোবাজারির শাস্তি সম্পর্কে বলা হয়েছে। আইনটির ২৫(১) ধারায় বলা হয়েছে, ‘কেউ মজুত বা কালোবাজারের অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হলে সে ব্যক্তি মৃত্যুদণ্ড, যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বা ১৪ বছর কারাদণ্ড, তদুপরি জরিমানার দণ্ডেও দণ্ডিত হবেন। তবে শর্ত থাকে যে, মজুতের অভিযোগে অভিযুক্ত ব্যক্তি যদি প্রমাণ করেন আর্থিক বা অন্যবিধ লাভ করার উদ্দেশ্যে নয়, বরং অন্য কোনো উদ্দেশ্যে মজুত করেছিল, তবে তিনি তিন মাস পর্যন্ত কারাদণ্ড ও জরিমানার দণ্ডে দণ্ডিত হবেন।’ তবে তথ্য বলছে, এ আইনেও সিন্ডিকেট ও মজুতকারীদের কখনো কোনো দৃষ্টান্তমূলক সাজার নজির নেই।
এবছর নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারের অস্থিরতা গড়ায় হাইকোর্ট পর্যন্ত। এ নিয়ে রিটও হয়েছিল গত মার্চে। ওই সময় নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়িয়ে বাজার অস্থিতিশীল করা অবৈধ জোটবদ্ধ (সিন্ডিকেশন) ব্যবসা বন্ধে সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ব্যর্থতা কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না, তা জানতে চাওয়া হয় রুলে। একই সঙ্গে দাম বাড়িয়ে বাজার অস্থিতিশীল করা দুষ্কৃতকারীদের খুঁজে বের করে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা কমিশনকে বলা হয়। এরপর নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মজুতদারদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেন হাইকোর্ট।
এছাড়া অবৈধ জোটবদ্ধ ব্যবসা প্রতিরোধে প্রতিযোগিতা আইন, ২০১২-এর ২১ (১) ধারা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় প্রবিধান প্রণয়নে কেন নির্দেশ দেওয়া হবে না, একই সঙ্গে চাল, ডাল, গম, চিনি, পেঁয়াজ ও ভোজ্যতেলের মতো পণ্য বিক্রির ওএমএস (খোলাবাজারে বিক্রি) নীতিতে রেশন কার্ডের বিধান অন্তর্ভুক্ত করতে কেন নির্দেশ দেওয়া হবে না, রুলে সে প্রশ্নও রাখা হয়। একই সঙ্গে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের নিষ্ক্রিয়তা ও ব্যর্থতা কেন অবৈধ ঘোষণা হবে না, তাও জানতে চাওয়া হয় রুলে।
