এনএনবি : আগামী জাতীয় নির্বাচনের আগে ডলারের আনুষ্ঠানিক দাম বাজারভিত্তিক করা হবে না বলে জানিয়ে দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এমন সিদ্ধান্তের পেছনে তিনটি কারণ উল্লেখ করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। দেশের চলতি হিসাব, আর্থিক হিসাব ও রাজস্ব হিসাবÑ এই তিনটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক এখন ঋণাত্মক অবস্থায় রয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলছে, এমন পরিস্থিতিতে ডলারের দাম বাজারের ওপর ছেড়ে দিলে রিজার্ভ আরও কমে যেতে পারে। বুধবার বাংলাদেশ ব্যাংকে বেসরকারি খাতের ১৫টি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের (এমডি) সঙ্গে এক সভায় গভর্নর আব্দুর রউফ তালুকদার এমন নির্দেশনা দেন বলে সভা সূত্রে জানা গেছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১-২২ অর্থবছরে শেষে রিজার্ভ ছিল ৪ হাজার ১৮০ কোটি ডলার বা ৪১ দশমিক ৮০ বিলিয়ন ডলার। আর ১১ অক্টোবর সেই রিজার্ভ কমে হয়েছে ২ হাজার ৬৮৪ কোটি ডলার বা ২৬ দশমিক ৮৪ বিলিয়ন ডলার। তবে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) হিসাবপদ্ধতি অনুযায়ী রিজার্ভ আরও কম—২ হাজার ১০৭ কোটি ডলার বা ২১ দশমিক শূন্য ৭ বিলিয়ন ডলার। আর নেট রিজার্ভ ধরলে তা এখন ১৭ বিলিয়ন বা ১ হাজার ৭০০ কোটি ডলারের নিচে বলে জানা গেছে।
সভা সূত্রে জানা গেছে, ডলারের দাম বাজারের ওপর ছেড়ে দিলে রিজার্ভ আরও কমতে পারে, এমন আশঙ্কা জানিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক বলেছে, এতে প্রয়োজনীয় পণ্য আমদানিও বন্ধ হয়ে যেতে পারে। ফলে পণ্যের দাম আরও বেড়ে যাবে। ডলারের দাম এখনই বাজারভিত্তিক হবে, এমন আশা না করে সংকট মেটাতে রপ্তানি আয় দ্রুত দেশে আনার তাগিদ দেয় নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি। বিশেষ করে গত ২০২২-২৩ অর্থবছরের ৯০০ কোটি ডলার ও চলতি অর্থবছরের ৩০০ কোটি ডলার এখনো দেশে আসেনি বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এই রপ্তানি আয় দ্রুত দেশে ফেরত আনতে হবে।
দেশের আর্থিক সূচকগুলো ভালো করতে গভর্নর বিদেশ থেকে ডলার সংগ্রহের জন্য চেষ্টা করে যাচ্ছেন বলে সভায় উল্লেখ করা হয়। সামনের দিনগুলোতে তিনি আরও কিছু দেশে সফরে যাবেন।
সভায় ব্যাংকগুলোর পক্ষ থেকে ডলারের দামের প্রসঙ্গ তোলা হলে গভর্নর জানান, ডলারের দাম বাজারভিত্তিক করার চেষ্টা চলছে। তবে নতুন একটি পদ্ধতির মাধ্যমে তা করা হবে। এ জন্য কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণে পাঠানো হচ্ছে। সভায় আরও বলা হয়, নির্বাচন হয়ে গেলে এবং রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা কেটে গেলে আর্থিক খাতেও অনিশ্চয়তা কাটবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরামর্শে এখন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশ (এবিবি) এবং বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেনকারী ব্যাংকগুলোর সংগঠন বাংলাদেশ ফরেন এক্সচেঞ্জ ডিলারস অ্যাসোসিয়েশন (বাফেদা) ডলারের দাম নির্ধারণ করছে। বর্তমানে প্রবাসী ও রপ্তানি আয়ের বিপরীতে প্রতি ডলারের আনুষ্ঠানিক দাম ১১০ টাকা, আর আমদানির ক্ষেত্রে দাম ১১০ টাকা ৫০ পয়সা।
সভায় দি সিটি ব্যাংক, ইস্টার্ণ ব্যাংক, প্রাইম ব্যাংক, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক ও ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের এমডি ছাড়াও উপস্থিত ছিলেন আরও ১০টি ব্যাংকের এমডিরা, যাদের ট্রেজারিপ্রধানদের জরিমানা করা হয়েছিল। এই ব্যাংকগুলো হলো সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংক, মার্কেন্টাইল ব্যাংক, মধুমতী ব্যাংক, মিডল্যান্ড ব্যাংক, ব্র্যাক ব্যাংক, এক্সিম ব্যাংক, প্রিমিয়ার ব্যাংক, শাহজালাল ইসলামী ব্যাংক ও ট্রাস্ট ব্যাংক।
সভা সূত্র জানায়, বাংলাদেশ ব্যাংকের পরামর্শে কয়েকটি ব্যাংক বেঁধে দেওয়া দরের চেয়ে বেশি দামে প্রবাসী আয় আনছে। কিন্তু এসব ব্যাংক আমদানিতে ডলারের বেশি দাম রাখতে পারছে না। এমন পরিস্থিতিতে করণীয় নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে আলোচনার প্রস্তাব দিয়েছিল ব্যাংকগুলো। যদিও বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেননি। ফলে বেশি দামে কেনা ডলার বেশি দামে বিক্রি করতে কোনো বাধা নেই বলে মনে করছেন বৈঠকে অংশ নেওয়া একাধিক ব্যাংকের এমডি।
সভা শেষে এবিবির চেয়ারম্যান ও ব্র্যাক ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সেলিম আর এফ হোসেন সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বলেন, প্রবাসী আয়ের প্রবাহ বাড়াতে ডলারের বিনিময় হার হুন্ডির পর্যায়ে নিয়ে গেলেও লাভ হবে না। ডলারের বিনিময় হার ১৩০ টাকা নির্ধারণ করা হলেও দেখা যাবে হুন্ডিওয়ালারা ১৪০ টাকা দেবে। বিষয়টি হলো, যারা বিদেশে টাকা পাচার করে, তাদের কাছে বিনিময় হার কোনো বিষয় নয়, যেকোনো মূল্যে তারা তা করবে। এসব তো কালোটাকা; ফলে পাচারকারীরা যেকোনো মূল্যে ডলার কিনে টাকা পাচার করবে।
খোলাবাজারে ডলারের দাম প্রসঙ্গে সেলিম আর এফ হোসেন বলেন, এই বাজারে বছরে তিন থেকে চার কোটি ডলার লেনদেন হয়। তবে দেশের অর্থনীতির যে আকার, তার সাপেক্ষে এটি খুবই সামান্য। ফলে খোলাবাজারের ডলারের বিনিময় হারকে মানদণ্ড হিসেবে দেখানোর প্রয়োজন নেই।
