এনএনবি : ঈদের আগে ভয়াবহ আগুনে পুড়ে গেছে দেশের অন্যতম বড় কাপড়ের মার্কেট ঢাকার বঙ্গবাজার।
ফায়ার সার্ভিসের গণমাধ্যম বিভাগের কর্মকর্তা আনোয়ারুল ইসলাম দোলন জানান, সকাল ৬টা ১০ মিনিটে ওই মার্কেটে আগুন লাগার খবর পান তারা।
ফায়ার সার্ভিসের ৫০টি ইউনিটের পাশাপাশি সেনা বাহিনী ও বিমানবাহিনীর দুটি দল প্রায় সাড়ে ছয় ঘণ্টার চেষ্টায় বেলা ১২টা ৩৬ মিনিটে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে।
তবে এরই মধ্যে বঙ্গবাজার মার্কেট, মহানগর মার্কেট, আদর্শ মার্কেট ও গুলিস্তান মার্কেট পুরোপুরি ভষ্মীভূত হয়। পাশের এনেক্সকো টাওয়ার এবং আরও কিছু ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয় আগুনে।
ফায়ার সার্ভিস কর্মীরা জানান, বঙ্গবাজারের পাশেই ফায়ার সার্ভিস সদর দপ্তর বলে খবর পাওয়ার দুই মিনিটের মধ্যে সেখানে প্রথম ইউনিট পৌঁছায়। এরপর ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে ইউনিটের সংখ্যা। কিন্তু বাতাসের মধ্যে ঘিঞ্জি ওই মার্কেটের আগুন ছড়িয়ে পড়তে থাকে।
এ ঘটনায় ফায়ার সার্ভিসের পাশাপাশি আগুন নিয়ন্ত্রণে যোগ দিয়েছে সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনী।
ওই অবস্থায় ঢাকায় ফায়ার সার্ভিসের অধিকাংশ ইউনিটকে সেখানে ডাকা হয়। বহু দূর থেকেও বঙ্গবাজারের আকাশে ধোঁয়ার কুণ্ডলী উঠতে দেখা যায়। বিমান বাহিনীর হেলিকপ্টার থেকেও আগুনের ওপর পানি ছিটানো হয়।
পর্যাপ্ত পানির সংকট থাকায় ঘটনাস্থলের নিকটে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক মুসলিম হলের পুকুর থেকে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা পানি সংগ্রহের জন্য ব্যবস্থা করেন। হল কর্তৃপক্ষ সঙ্গে সঙ্গে তাদেরকে গেট খুলে দেয়।
ফায়ার সার্ভিসের দায়িত্বগত কর্মকর্তা শরিফুল ইসলাম বাংলাদেশকে বলেন, পুকুরে পর্যাপ্ত পানি রয়েছে। আশা করছি এ পানি দিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণ চলে আসবে।
ব্যবসায়ী আবুল কালাম বলেন, হলের পুকুর না থাকলে পানির ব্যাপক সংকট হতো। কারণ ফায়ার সার্ভিস যে পানি এনেছিল তা দ্রুতই শেষ হয়ে গিয়েছিল।
বড় এলাকায় টিন ও কাঠ দিয়ে নির্মিত শত শত দোকান নিয়ে এই বঙ্গবাজার। ঈদ সামনে রেখে সব দোকানেই প্রচুর নতুন পণ্য তোলা হয়েছিল। কীভাবে সেখানে আগুন লাগল তা এখনও স্পষ্ট নয়।
ফায়ার সার্ভিসের তিন সদস্যসহ ৮ জন আহত ও অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। কারও মৃত্যুর খবর এখনও আসেনি।
সকালে ব্যবসায়ী ও দোকানকর্মীদের কাউকে কাউকে মরিয়া হয়ে মালামাল সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করতে দেখা যায়। অনেকেই অসহায়ভাবে কাঁদছিলেন। একজন বলছিলেন কয়েক লাখ টাকার মাল তিনি দোকানে তুলেছিলেন ঈদ সামনে রেখে।
একাধিক ব্যবসায়ী জানিয়েছেন, এখানে অধিকাংশই পাইকারি দোকান। ঈদ আর নববর্ষ উপলক্ষে পুরো মাস ব্যবসা ভালো হবে আশায় তারা নিজেদের দোকানে শার্ট-প্যান্ট, শাড়িসহ বিভিন্ন ধরনের কাপড়ের স্টক বাড়িয়েছিলেন। বঙ্গবাজারে পাঁচ শতাধিক শাড়ির দোকান ছিল। সবগুলো দোকান আগুনে ভস্মীভূত হয়েছে।
মার্কেটের মিলন ফ্যাশন ফেয়ারের মালিক শরীফ উদ্দীন বলেন, আমার সব রেডিমেট আইটেম ছিল। ঈদ উপলক্ষে বেশি বিক্রি হয় প্রতি বছর। এ কারণে অনেক কাপড় সংগ্রহ করেছি। কিন্তু এখন নিস্ব হয়ে গেলাম!
আরেক ব্যবসায়ী রাসেল উদ্দীন বলেন, চোখের সামনে সব পুড়ে গেল, কিছুই করতে পারলাম না। আমার কর্মচারীরা আসতে দেরি করায় অন্য দোকানদাররা কিছু মালামাল বের করতে পারলেও আমি কিছু বের করতে পারিনি।
ফায়ার সার্ভিস আগুন নিয়ন্ত্রণে আনার কথা বললেও ঘটনাস্থলে বিভিন্ন জায়গায় আগুন জ্বলতে দেখা গেছে। বঙ্গ মার্কেটের বেশিরভাগ দোকান পুড়ে ছাই হয়ে গেছে।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, বঙ্গবাজারে অন্তত ছয়টি মার্কেটে আগুন লাগে। এর মধ্যে শুধু বঙ্গ মার্কেটেই ২৯০০ দোকান এবং সেখানে কাজ করেন প্রায় দেড় লাখ মানুষ।
বঙ্গবাজার মার্কেট, ইসলামিয়া মার্কেট, বঙ্গ ১০ কোটি মার্কেট, আদর্শ মার্কেট- এই চারটি মার্কেট এক জায়গায় হওয়ায় মূলত সবগুলোকেই লোকজন বঙ্গবাজার মার্কেট হিসেবে ডেকে থাকেন। এখান থেকে রাস্তার উল্টো পাশে এনেক্সকো ও বঙ্গো হোমিও মার্কেটেও আগুন ছড়িয়ে পড়েছিল।
মঙ্গলবারের এই অগ্নিকাণ্ডে ১২ হাজারের ওপরে দোকান পুড়ে গেছে বলে ধারণা করছেন ব্যবসায়ীরা। এর ফলে কয়েক হাজার কোটি টাকার ক্ষতির মুখে পড়বেন বলে তারা আশঙ্কা করছেন।
বঙ্গবাজারের এনেক্সকো টাওয়ারে রাশেদ বেডিং দোকানের ব্যবসায়ী মো. জকি বলেন, শুধু বঙ্গবাজার কাঠের মার্কেটে দুই টিনশেড মার্কেটে দোকান আছে আট হাজার। ওই মার্কেট সম্পর্ণ পুড়ে গেছে। এমন কোনও দোকান নেই যে সেটি পোড়েনি। এই মার্কেটে দোকানের নম্বরই রয়েছে ১২ হাজার।
এদিকে বঙ্গবাজারের এনেক্সকো টাওয়ারে ৫ থেকে ৭ তলা পর্যন্ত পুড়েছে। সেখানে প্রত্যেক তলায় ১১৫টির মতো দোকান রয়েছে।
প্রায় ২৪ বছর ধরে আনন্দবাজারে আছেন ব্যবসায়ী আল-আমীন। তিনি বলেন, “এরকম আগুন আগে কখনও দেখিনি।”
১৯৯৫ সালে একবার ভয়াবহ আগুনে পুড়ে রায় বঙ্গবাজার। পরে নতুন করে গড়ে তোলা হয় ওই মার্কেট।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মালিকানাধীন বঙ্গবাজার চারটি ইউনিটে বিভক্ত। বঙ্গবাজার কমপ্লেক্স, গুলিস্তান ইউনিট, মহানগর ইউনিট ও আদর্শ ইউনিট মিলিয়ে মোট দোকানের সংখ্যা ২ হাজার ৩৭০টি।
সর্বশেষ ২০১৮ সালের ২৪ জুলাই সেখানে আগুন লেগে মার্কেটের গুলিস্তান ইউনিটের কয়েকটি দোকান পুড়ে যায়।
