এনএনবি : স্মরণকালের ভয়াবহ বন্যায় তলিয়ে গেছে ফেনীর তিন উপজেলা ফুলগাজী, পরশুরাম ও ছাগলনাইয়ার দেড় শতাধিক গ্রাম। এতে পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন দুই লক্ষাধিক মানুষ, মানবেতর জীবনযাপন করছেন তারা।
বুধবার (২১ আগস্ট) বিপদসীমার ৮৬ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হতে দেখা গেছে মূহুরী, কহুয়া ও সিলোনীয়া নদীর পানি। রাস্তা-ঘাট, ঘরবাড়ি, ফসলের জমি- সবই ডুবে গেছে বানের জলে। ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন তিন উপজেলার দুই লক্ষাধিক মানুষ।
এর আগে মঙ্গলবার (২০ আগস্ট) একজন নিখোঁজের খবর পাওয়া গেলেও বুধবার সকাল পর্যন্ত তার কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি। তাৎক্ষণিকভাবে তার পরিচয়ও জানা যায়নি। তবে ওই সময় অনেকজনকেই জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে বলে জানান স্থানীয়রা।
জানা যায়, গত তিন দিনের ভারিবর্ষণ ও ভারতের উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে দেখা দিয়েছে মানবিক বিপর্যয়। ফুলগাজী উপজেলার সদর ইউনিয়ন, আনন্দপুর, মুন্সীরহাট, আমজাদহাট ইউনিয়নের ৪০টির বেশি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। পরশুরামের মির্জানগর, চিথলিয়া, বক্সমাহমুদ এবং পৌরশহরসহ ৪৫টির বেশি গ্রাম পানিতে তলিয়ে রয়েছে। ছাগলনাইয়ার পাঠান নগর, রাধানগর, শুভপুর ইউনিয়নেরও বেশ কয়েকটি গ্রামে সৃষ্টি হয়েছে বন্যার।
ফেনীর পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী মো. আবুল কাশেম জানান, টানা বর্ষণ আর ভারতীয় পাহাড়ি ঢলে মুহুরী-কহুয়া-সিলোনীয়া নদীর বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের ২৭টি ভাঙা অংশ দিয়ে হুহু করে পানি ঢুকছে লোকালয়ে।
তিনি জানান, গেল মাসের শুরুতে মুহুরী, কহুয়া ও সিলোনীয়া নদীর ১৫ স্থানে ভাঙন দেখা দেয়। সেসব স্থানে জোড়াতালির মেরামতের পর চলতি মাসের শুরুতে বাঁধের আরও ১২ স্থানে ভেঙে যায়, প্লাবিত হয় ১০০টির বেশি গ্রাম। অবকাঠামো, ধান, ফসল ও মাছের ক্ষতি ছাড়িয়ে যায় ৩০ কোটির বেশি। ১৫ দিনের মাথায় আবারও বন্যা দেখা দিয়েছে।
এ বিষয়ে পরশুরাম উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আফরোজা হাবিব শাপলা বলেন, ‘উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় নদীর ১২টি ভাঙন অংশ দিয়ে লোকালয়ে পানি প্রবেশ করছে। এতে অর্ধশতাধিক গ্রাম প্লাবিত হয়ে লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। নদীর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। দুর্যোগ মোকাবিলায় ৫০০ প্যাকেট শুকনো খাবার ও ৫০ টন চাল মজুত রয়েছে।’
ফুলগাজী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) তানিয়া ভূঁইয়া বলেন, ‘বন্যার পানিতে উপজেলার তিনটি ইউনিয়নের ৪০টি গ্রাম প্লাবিত হয়ে কয়েক হাজার পরিবার পানিবন্দি রয়েছেন। এখনও প্রবল স্রোতে লোকালয়ে পানি প্রবেশ করছে।’
এদিকে, বন্যা দুর্গতদের জন্য ত্রাণ সহায়তা নিয়ে মাঠে নেমেছে স্থানীয় প্রশাসন ও বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন। সেনাবাহিনী, বিজিবি কোস্টগার্ড, ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা সহায়তা ও উদ্ধার অভিযানে তৎপর রয়েছেন।
এর মধ্যে জেলায় গত ২৪ ঘণ্টায় ৯৭ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করেছে আবহাওয়া অফিস।
ফেনী আবহাওয়া অধিদপ্তরের উচ্চ পর্যবেক্ষক মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান জানান, গত ৪৮ ঘণ্টায় ২৮২ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। আগামী কয়েকদিন জেলাজুড়ে বৃষ্টি অব্যাহত থাকার সম্ভাবনা আছে।
পরশুরাম উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আফরোজা হাবিব বলেন, প্রবল স্রোতে ভেসে যাওয়ায় একজন নিখোঁজ রয়েছে। মঙ্গলবার রাত পর্যন্ত ডিঙি নৌকা দিয়ে প্রায় ১০০ মানুষকে উদ্ধার করা হয়েছে। জরুরি ভিত্তিতে উদ্ধার কাজ পরিচালনা করার জন্য সেনাবাহিনী এবং কোস্ট গার্ডের সহায়তা চাওয়া হয়েছে।
ফুলগাজী উপজেলা আনন্দপুর ইউনিয়নের বন্দুয়া গ্রামের শহিদুল্লাহ চৌধুরী কিসমত বলেন, “জন্মের পর এমন বন্যা কখনও দেখিনি। মঙ্গলবার বিকালে বাড়ির উঠানে পানি থাকলেও বুধবার সকাল থেকে ঘরে পানি ঢুকে যায়। পানিবন্দি হওয়ায় ছেলে-মেয়েদের অন্যত্র পাঠিয়ে দিয়েছি।”
একই গ্রামের নাসরিন বেগম বলেন, চুলা পানিতে ডুবে গেছে। মঙ্গলবার থেকে রান্না হচ্ছে না। বাড়ির সবাই না খেয়ে আছে। কেউ কোনো ধরনের সাহায্য করছে না।
ফুলগাজী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তানিয়া ভূঁইয়া বলেন, “উপজেলায় স্মরণকালের সবচেয়ে ভয়াবহ বন্যায় ছয়টি ইউনিয়নের প্রায় অধিকাংশ গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। পানিবন্দি হয়ে পড়েছে অসংখ্য মানুষ। পানির উচ্চতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। এখন পর্যন্ত একজনের মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গিয়েছে।”
তিনি জানান, মঙ্গলবার রাত ১০টা থেকে ফায়ার সার্ভিস এবং স্বেচ্ছাসেবক ছাত্রদের সহায়তায় দুইটা ডিঙি নৌকা দিয়ে বন্যার্তদের উদ্ধার করে নিরাপদ আশ্রয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। এখন পর্যন্ত প্রায় ৩০০ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে। সেনাবাহিনী এবং কোস্ট গার্ডের সহায়তায়ও উদ্ধার কাজ শুরু হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, “উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত ৫০০ প্যাকেট শুকনো খাবার বিতরণ করা হয়েছে। আমাদের নিকট আরও ৫০০ প্যাকেট শুকনো খাবার এবং ১৮ টন চাল মজুদ রয়েছে।”
বন্যাদুর্গতদের উদ্ধারে কাজ করা স্বেচ্ছাসেবক মাহবুবা তাবাচ্ছুম ইমা বলেন, দু-দিন ধরে তারা শতাধিক স্বেচ্ছাসেবক পানিবন্দিদের উদ্ধারে কাজ করছেন। তবে পানি বেশি থাকায় ডিঙি নৌকায় উদ্ধার অভিযান চালানো যাচ্ছে না। স্পিডবোট ছাড়া ফুলগাজী-পরশুরামের দুর্গত এলাকাগুলোতে যাওয়া সম্ভব নয়।
পরশুরামের শালধর গ্রামের আবু ইউসুফ বলেন, “বেশিরভাগ এলাকার একচালা ও পাকাঘর (একতলা) ডুবে গেছে। কোথাও আশ্রয় নেওয়ার মতো অবস্থান নেই। বন্যা দুর্গতদের উদ্ধারে কোনো তৎপরতা দেখা যাচ্ছে না। ”
এদিকে টানা বৃষ্টিতে ফেনী পৌর শহরের বেশিরভাগ সড়ক পানিতে তলিয়ে গেছে। ফলে এসব সড়কে বসবাসকারী বাসিন্দা ও পথচারীরা পড়েছেন চরম ভোগান্তিতে।
শহর ঘুরে দেখা গেছে, ফেনী শহরের মিজান রোড, একাডেমি রোড, শাহীন একাডেমি, শহীদ শহীদুল্লা কায়সার সড়ক, রামপুর, তাকিয়া রোড, আবু বক্কর সড়ক, ফেনী বড় বাজারের বিভিন্ন গলি, বারাহীপুর এলাকা, মহিপাল চৌধুরী বাড়ী সড়ক, পাঠান বাড়ী রোডসহ বিভিন্ন সড়ক পানিতে তলিয়ে গেছে।
এসব সড়কে চলাচল করতে গিয়ে পানি প্রবেশ করে সিএনজিচালিত অটোরিকশার ইঞ্জিন বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন পথচারী ও বাসিন্দারা।
ফেনী পৌরসভার সচিব সৈয়দ মো. আবুজর গিফরী বলেন, কয়েকদিনের ভারী বর্ষণে সড়ক থেকে পানি নামতে সময় লাগছে। পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা শহরের বিভিন্ন ড্রেন পরিষ্কারে কাজ করছে। পানি নেমে যাওয়া পর্যন্ত এ কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।
জেলা প্রশাসক মোসাম্মৎ শাহীনা আক্তার বলেন, বন্যা দুর্গতদের সহায়তায় সব ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
জনপ্রয়
সর্বশেষ
- বেড়া প্রেসক্লাবের আহ্বায়ক কমিটি গঠন সজীব আহ্বায়ক ও গিফারী সদস্য সচিব
- আটঘরিয়ায় নতুন ইউএনও তাহমিদুল ইসলামের দায়িত্ব গ্রহণ
- বিশ^ পরিবেশ দিবস উপলক্ষে বৃক্ষরোপণ ও মানববন্ধন
- উত্তরণ পাবনার ১৯তম বর্ষ পদার্পনে সাংস্কৃতিক উৎসব অনুষ্ঠিত
- জেলা প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির সাবেক সাধারন সম্পাদক মরহুম আব্দুল কাদের মাস্টারের সহধর্মীনির দাফন সম্পন্ন
- সুজানগরে ভাড়ার ভারে যাত্রীরা দিশেহারা
- মায়ের কোল থেকে ছিটকে পড়ে শিশুর মৃত্যু তাকে বাঁচাতে প্রাণ গেলো মোটরসাইকেল আরোহীর
- ১ কেজি গাঁজাসহ মাদক কারবারি আটক
