জাহাঙ্গীর আলম মুকুল: বাংলা লোক সঙ্গীতের এক অমর বাউল শিল্পী গগন চন্দ্র দাস। বাংলাদেশের বৃহত্তর কুষ্টিয়া জেলার শিলাইদহের আড়পাড়া গ্রামে তাঁর জন্ম। ডাকঘরে চিঠি বিলি পেশা ছিল বলে গগন হরকরা নামেই তিনি বেশি পরিচিত। শিলাইদহে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর বাউল গানে মুগ্ধ হয়েছিলেন। গগন চন্দ্রের ‘কোথায় পাব তারে’ আমার মনের মানুষ যেরে/হারিয়ে সেই মানুষে, তার উদ্দেশে দেশ বিদেশে/আমি দেশ বিদেশে বেরাই ঘুরে। বাউল গানের সুরে অনুপ্রাণিত হয়ে কবি রচনা করেছিলেন ‘আমার সোনারবাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি’, যা বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীত হয়ে ওঠে।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর গানটি রচনা করেন ১৯০৫ সালে। ১৯০৫ সালের রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী রচনা করেন কবিতা বাংলা নামে দেশ, ছাপা হয় বঙ্গলক্ষ্মীর ব্রতকথায়।
লর্ড কার্জন লড় লাট হিসেবে ক্ষমতা নিয়েই বঙ্গভঙ্গের প্রস্তাব করলেন এবং ১৯০৩ সালের ডিসেম্বর মাসে গেজেট বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে বাংলাদেশ দ্বিখন্ডিত হলো।
১৯৪৭ সালের ৩ জুন বড় লাট লর্ড মাউন্টব্যাটেন ভারত ভাগের সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেন। এই ঘোষণা সমর্থন করে রেডিওতে ভাষণ দেন পণ্ডিত জওহরলাল নেহরু, মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ এবং সরদার বলদেব সিং। দ্বিজাতিতত্বের ভিত্তিতে ভারতবর্ষ ভাগ হলো। নতুন রাষ্ট্র পাকিস্তান।
১৯৫৪ সালের মার্চ মাসে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ২ এপ্রিল শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক যুক্তফ্রন্টের নেতা হিসেবে মন্ত্রিসভা গঠন করেন।
১৯৫৬ সালের ২৩ মার্চ পূর্ববঙ্গের নাম পূর্ব পাকিস্তান করে পাকিস্তানের শাসনতন্ত্র প্রণীত হয় হয় এবং দেশের নাম গৃহীত হলো পাকিস্তান ইসলামী প্রজাতন্ত্র। বাঙালির কাছে স্পষ্ট হয় পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকেরা অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক, সামরিক অধিকার ছিনিয়ে নিয়ে দেশবাসীকে ক্রমাগত শোষণ করতে থাকে। অধিকার আদায়ের জন্য বাংলার মানুষ রাজপথে নামে।
পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট মেজর জেনারেল ইস্কান্দার মির্জা ও সামরিক বাহিনী প্রধান জেনারেল আইয়ুব খান সামরিক শাসন জারি করেন ৭ অক্টোবর ১৯৫৮ সালে। শেখ মুজিব গ্রেফতার হন ১৯৫৮ সালের অক্টোবর মাসে গ্রেফতার হয়ে ১৪ মাস জেল খেটে ১৯৫৯ সালের ৭ ডিসেম্বর মুক্তি দিয়ে আবার জেল গেটে গ্রেফতার হন। ১৯৬০ সালে ৭ ডিসেম্বর মুক্তি পান হাইকোর্টে রিট আবেদন করে। সামরিক শাসক আইয়ুব খানের বিরুদ্ধে বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সংযোগে আন্দোলন গড়ে তোলার জন্য সক্রিয় হয়ে ওঠেন, পাশাপাশি ‘স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী পরিষদ’ নামে গোপন সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৬১ সালে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সাথে যোগাযোগ করতে থাকেন। ১৯৬২ সালের ফেব্রুয়ারিতে গ্রেফতার। ‘শিক্ষা কমিশন’ রিপোর্ট বাতিলের দাবি, ১৯৬৪ সালে সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদ গঠনে দাঙ্গা প্রতিরোধ কমিটি গঠন, ‘পূর্ব পাকিস্তান রুখিয়া দাঁড়াও’ প্রচারপত্র বিলি। শেখ মুজিব গ্রেফতার, ১৯৬৫ শেখ মুজিবের ১ বছর কারাদণ্ড, জানুয়ারি মাসে মৌলিক গঠনতন্ত্রের ভিত্তিতে আইয়ুব খান প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত এবং সেপ্টেম্বর মাসে কাশ্মীর ইস্যুতে ১৭ দিন পাক ভারত যুদ্ধ। ১৯৬৬ সালে লাহোরে বিরোধী দলের সম্মেলনে শেখ মুজিব ৬ দফা কর্মসূচি ঘোষণা করেন। ৬ দফা মূলত পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্বশাসনের দাবি। প্রধান নেতৃত্ব চলে আসে শেখ মুজিবুর রহমানের কাছে।
১৯৬৬ সালের শেষের দিকে ছয় দফার আন্দোলনের অংশ হিসেবে সিরাজগঞ্জে জনসভা করতে আসেন শেখ মুজিবুর রহমান। সফল এই জনসভায় একটি তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা ঘটে। উদ্বোধনী সঙ্গীত হিসেবে জনসভায় ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি’ রবীন্দ্রসঙ্গীতটি পরিবেশন করা হয়। ১৯৬৭ সালে আবার গ্রেফতার।
১৯৬০ থেকে ১৯৬৯ সাল পর্যন্ত এই দীর্ঘ পথ পরিক্রমায় আন্দোলনের বিভিন্ন ধারায় পথসভা, জনসভা, কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হতে থাকে। বিভিন্ন জনসভার পূর্বে শেখ মুজিব শিল্পীদের দিয়ে মঞ্চে ভাওয়াইয়া, ভাটিয়ালী, গণসংগীত, দেশাত্মবোধক গান পরিবেশনের ব্যবস্থা করতেন। এবং প্রতিটি জনসভাতে দুটি গানের অনুরোধ করতেন। ‘আজি বাংলাদেশের হৃদয় হতে কখন আপনি/তুমি এই অপরূপ রূপে বাহির হলে জননী’ অথবা ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি’।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব যে সব সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকতেন, সেখানে তিনি শিল্পীদের ডেকে আলাদাভাবে অনুরোধ করতেন অথবা মঞ্চে কাগজের চিরকুট পাঠিয়ে জানাতেন, তাঁরা যেন আমার সোনার বাংলা’ গানটি অথবা রবীন্দ্রনাথের কোন স্বদেশ পর্যায়ের গান পরিবেশন করেন।
১৯৬৯ সালের দিনগুলিতে পাকিস্তানের শাসনের বিরুদ্ধে গণআন্দোলন প্রবলতর হয়ে উঠেছিল শহর ছাড়িয়ে বাংলাদেশের সকল গ্রাম-গঞ্জে, হাট বাজারে তখন পূর্ববঙ্গের কন্ঠ শিল্পীরা বিভিন্ন উপলক্ষে আয়োজিত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে কোন সে গভীর প্রাণের টানে আমার সোনার বাংলা’ গান পরিবেশন করতেন কে জানে?
মুক্তিযুদ্ধের সময় স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল ভারতের বিভিন্ন জায়গায় প্রীতি ম্যাচ খেলার পূর্বে সোনার বাংলা গান পরিবেশন করতেন।
১৯৭১ সালে যখন স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের সমাপনী ঘোষণা হিসেবে বাজতো, শ্রোতারা উভয় বাংলা পেরিয়ে ভারতসহ পৃথিবীর অন্য সব অঞ্চলের বাঙালিরা বুঝতে পারতেন, এটাই বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীত। ‘আমার সোনার বাংলা’ কোন সুনির্দিষ্ট প্রশাসনিক ঘোষণার মাধ্যমে নয়, জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে তার গ্রহণীয়তা ও স্বীকৃতি অর্জন ঘটেছিল স্বতঃস্ফূর্তভাবে মুক্তিযুদ্ধের এক অমোঘ সাংস্কৃতিক সোপান হিসাবে।
সংগীত শিল্পী গবেষক ড. সনজীদা খাতুন ৫ মে ২০০৫ সালে দৈনিক ‘জনকন্ঠে’- তাঁর স্মৃতিচারণে লিখেছেন: ‘১৯৫৬ সালের প্রথমার্ধে ঢাকাতে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় নেতাসহ প্রাদেশিক নেতাদের এক বৈঠক হয়েছিল। সংশ্লিষ্ট সকলের জন্যে কার্জন হলে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন হয়। সেই সন্ধ্যায় শেখ মুজিবুর রহমান আমাকে ‘আমার সোনার বাংলা’ গানটি গাইতে খবর পাঠান, এর তাৎপর্য তখন বুঝিনি, আজ বুঝতে পারি। সেদিন পশ্চিম পাকিস্তানের সদস্যদের কাছে সোনার বাংলা বিষয়ে বাঙালি আবেগ অনুভূতি তুলে ধরতে চেয়েছিলেন এদেশের নেতা।’
ড. সনজীদা তাঁর আত্মজীবনীতে উল্লেখ করেছেন ‘রবীন্দ্র সংগীত শিল্পী জাহিদুর রহিম প্রসঙ্গে লিখেছেন: “জাহিদ স্বাধীনতার আগে বঙ্গবন্ধুর জনসভায় ‘আমার সোনার বাংলা’ গাইত সব সময়।
নাট্য ব্যক্তিত্ব রামেন্দু মজুমদার ‘রবীন্দ্রনাথ ও বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক আন্দোলন’, প্রবন্ধে লিখেছেন: “বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানের অনেক জনসভার শুরুতে শিল্পী জাহিদুর রহিম বা অজিত রায়ের কণ্ঠে গীত হতো, ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি’।
বেতার কর্মকর্তা আশরাফ-উজ-জামান তাঁর লেখা ‘দেশের বেতার ও শেখ মুজিব’ প্রবন্ধে লিখেছেন “দেশের সর্বসম্মত নেতা বলে তিনি জনসমর্থন পান আগরতলা মামলা কালে। প্রবল গণআন্দোলনে আইয়ুব খান ও মোনেম খানের অপসারণের পর প্রথম বেতারের অনুষ্ঠান প্রচার নিয়ে আলাপ হয় শেখ মুজিবর রহমানের সঙ্গে। তিনি বললেন, দেশের সঙ্গে সমন্বয় রেখে অনুষ্ঠান প্রচার করতে না পারলে বেতার বন্ধ করে দিন। পরে কাছে এসে হেসে বলেছিলেন, একবার রবীন্দ্রনাথের ‘আমার সোনার বাংলা’ গানটি বেতার থেকে প্রচার করতে পারেন না’?
জাহিদুর রহিম অনন্য সাধারণ রবীন্দ্র সংগীত শিল্পী। ষাটের দশকের পাকিস্তান সরকার রবীন্দ্র সংগীত উচ্ছেদ নীতির প্রতিকূলে গিয়ে সভা, সমাবেশ ও বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে দেশের গান রবীন্দ্র সংগীত এবং ‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি’ গান পরিবেশন করে অসাধারণ সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছেন। উনসত্তুরের গণ অভুত্থানের প্রেক্ষাপটেও গানটি নিরবচ্ছিন্ন পরিবেশন করেন।
জহির রায়হনের ‘জীবন থেকে নেয়া’ চলচ্চিত্র মুক্তি পায় ১৯৭০ সালে ১০ এপ্রিল। এই চলচ্চিত্রে তিনি ‘আমার সোনার বাংলা’ গানটি সার্থকভাবে ব্যবহার করেছেন। চলচ্চিত্র যেহেতু শক্তিশালী গণমাধ্যম সেই জন্যে গণঅভ্যুত্থান, বাঙালি জাতীয়তাবাদ এবং স্বাধীনতার স্বপ্নে জাতিকে আবেগ আপ্লুত করেছিল গানটি।
অসহযোগ আন্দোলনের সময় থেকে আপনাআপনিই যেন রবীন্দ্রনাথের এ গান হয়ে উঠলো আমাদের জনগণের গান, দেশের প্রতি ভালোবাসা প্রকাশের গান। বঙ্গবন্ধু তখনই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন দেশ স্বাধীন হলে এ গানই হবে আমাদের জাতীয় সংগীত।
‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে ঘিরে কিছু ঘটনা ও বাংলাদেশ গ্রন্থে’ জামাতা এ ওয়াজেদ মিয়া লিখেছেন – ১৫ ফেব্রুয়ারি ১৯৭১ সেদিন রাতে খেতে খেতে বঙ্গবন্ধু এক প্রকার গম্ভীর হয়ে আমাদের উদ্দেশ্য করে বললেন, ‘দেশটা যদি কোনদিন স্বাধীন হয়, তাহলে জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে কবি গুরুর আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালবাসি গানকে জাতীয় সংগীত হিসেবে গ্রহণ করো…। তথ্যসূত্র: ইত্তেফাক, ১৬ ফেব্রুয়ারি, ১৯৭১
১৯৭১ সালের ৩ মার্চ স্বাধীনতার ইশতেহার দিবস। এই দিন বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে এবং উপস্থিতিতে স্বাধীন বাংলা কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের উদ্যোগে পল্টন ময়দানে ইশতেহার পাঠ, পূর্ব বাংলার ম্যাপ খচিত জাতীয় পতাকা এবং বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের রচিত ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি’ গানটি পরিবেশিত হয় এবং জাতীয় সংগীত হিসেবে নির্বাচিত করা হয়।
২৩ মার্চ ছিল পাকিস্তান দিবস। আর বাঙালীর প্রতিরোধ দিবস। ওইদিন রেডিও-টেলিভিশনের অনুষ্ঠান মালা শেষে পূর্ব বাংলায় যাতে পাকিস্তানি জাতীয় সঙ্গীত আর না বাজে, সেজন্যে সেদিনের সরকারি গণমাধ্যমের বাঙালি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এক দুঃসাহসিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। রাতের নির্ধারিত অনুষ্ঠান শেষ হবার পর তাঁরা রবীন্দ্র সঙ্গীত, নজরুলের গান ও দেশাত্মবোধক গানের সম্প্রচার অব্যাহত রাখেন।
১৯৭১ সালে বাংলাদেশ ছেড়ে যেতে বাধ্য হয়েছিলেন তরুণ বয়সী শিল্পীরা যারা প্রবাসে বাংলাদেশ মুক্তি সংগ্রামী শিল্পী সংস্থা নামে সংগঠন সৃষ্টি করে পথে-প্রান্তরে দূর-দূরান্তে গান গেয়ে বেড়িয়েছেন। তাঁরা সঙ্গীত পরিবেশনার সময় ‘আমার ভায়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্র“য়ারি এবং আমার সোনার বাংলা’ পরিবেশন করতেন। এদের সাথে যুক্ত হয়ে শরণার্থী শিবিরের লাখো আশ্রিতদের সীমাহীন কন্ঠ এবং পাকিস্তানের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ যুদ্ধের চিত্রায়নের মাধ্যমে একটি দেশের অভ্যুদয় দৃশ্যমান করে তুলেছেন সাংবাদিক লিয়ার লেভিনের ক্যামেরায় ফুটেজ। লিয়ার লেভিনের ফুটেজ উদ্ধার করে তারেক মাসুদ এবং তাঁর বিদেশী স্ত্রী ক্যাথেরিন মাসুদ চিত্রায়ন করেছেন তথ্য ভিত্তিক ছবি মুক্তির গান যেখানে আমার সোনার বাংলা গান পরিবেশিত হয়েছে অব্যাহত ভাবে।
মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের সঙ্গে অধিবেশনে সমাপনিতে বাজতো আমার সোনার বাংলা।
১৯৭২ সালের জানুয়ারিতে ব্রিটিশ সাংবাদিক ডেভিড ফ্রস্ট ঢাকায় এসে বঙ্গবন্ধুর সাক্ষাতকার গ্রহণ করেছিলেন। সাক্ষাতটি ১৮ জানুয়ারি ডঊঊড এবং ডঞঞএ ওয়াশিংটন টেলিভিশন থেকে প্রচারিত হয়।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তখন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী। ডেভিড ফ্রস্ট তাঁর সাক্ষাতকারের এক পর্যায়ে বঙ্গবন্ধুকে জিজ্ঞেস করেছিলেন-
ফ্রস্ট: একটি নতুন দেশের প্রথম সপ্তাহে আপনার কতো কিছু যে করার রয়েছে যেমন আপনি একটি পতাকা এবং জাতীয় সংগীত নির্ধারণ করেছেন।
শেখ মুজিব: হ্যাঁ। পতাকাটি অনেক দিন ব্যবহার করা হয়েছে, শুধু একটি ছোট পরিবর্তন এখন করা হয়েছে। আগে থেকে ব্যবহৃত হয়ে এসেছে জাতীয় সংগীতও, কিন্তু আমি সরকারি স্বীকৃতি দিতে চাইছিলাম এবং এখন আমি দিয়েছি। জাতীয় পতাকায় আমি একটি ছোট পরিবর্তন করেছি, কারণ এতে ইতোপূর্বে বাংলাদেশের মানচিত্র ছিল। কোন দেশ জাতীয় পতাকায় তার ভূখণ্ডের মানচিত্র দিতে পারে না।
ফ্রস্ট: কোনো এমনটা?
শেখ মুজিব: পৃথিবীর কোথাও হয়নি, আমরা পতাকায় আমাদের ভূখণ্ডের মানচিত্র রাখতে চাই না। আমি যা করেছি এবং আমাদের জনগণও গ্রহণ করেছে, তা হচ্ছে উদীয়মান সূর্য রেখে ভূখণ্ডের মানচিত্র বাদ দিয়ে দেওয়া।
ফ্রস্ট: আর জাতীয় সংগীত কার রচিত?
শেখ মুজিব: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের একটি পুরানো গান।
ফ্রস্ট: ইংরেজিতে এর বক্তব্যটি কী?
শেখ মুজিব: ইংরেজি ভাষায় নিলে বক্তব্য হচ্ছে, ‘আমি আমার সোনার বাংলাকে ভালোবাসি’। এভাবে এটি শুরু হয়, ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি’।
ফ্রস্ট: আর এটি এমন একটি গান যা বাংলাদেশে দীর্ঘকাল গাওয়া হয়েছে?
শেখ মুজিব: ১৯৭১ এর ৭ মার্চ তারিখে যখন রেসকোর্স ময়দানে আমাদের শেষ সভা করেছিলাম, সেখানে দশ লক্ষ লোক উপস্থিত ছিল এবং তারা ‘স্বাধীন বাংলা’ শ্লোগান দিচ্ছিল আর যখন শিল্পীরা গানটি গাইতে শুরু করলো, আমরা দশ লক্ষ লোক দাঁড়িয়ে এ গানকে অভিবাদন জানিয়েছিলাম। বলা যায়, আমাদের বর্তমান জাতীয় সংগীত আমরা তখনই গ্রহণ করেছিলাম।
বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে, ১৯৭২ এর ফেব্রুয়ারি, মার্চ ও এপ্রিল ছিল বাংলাদেশে সাংবাদিকদের খুবই ব্যস্ততার সময়। খবর সংগ্রহের সূত্রে শেখ সাহেবকে দেখতে পাই। দূর থেকে দেখি, কাছে থেকেও দেখি। হোটেল ইন্টারকনের চা পার্টিতে নিমন্ত্রণ সস্ত্রীক মিহির গাঙ্গুলীর। শেখ সাহেব ঘুরে ঘুরে আলাপ করতে করতে আমার স্ত্রীর কাছে আসতেই আমার স্ত্রী দু’হাতে মুখ ঢেকে ফুপিয়ে কেঁদে উঠেছে আবেগে। বজ্রকন্ঠের অধিকারী মাথায় হাত বুলিয়ে কোমল কণ্ঠে বললেন, ‘মাইয়া কাইন্দা দিছে’। পিএসকে নির্দেশ দিয়েছিলেন আমাদের একদিন গণভবনে নিয়ে যেতে। সরকারি নিমন্ত্রণে এক সন্ধ্যায় গণভবনে গেলাম। অজস্র ব্যস্ততার মাঝে কাছে বসিয়ে ব্যক্তিগত খবরাখবর নিলেন। ফেরার আগে আমার স্ত্রীর হাত বাড়িয়ে দেওয়া ডায়রিতে লিখলেন ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি।’ (সাংবাদিকের স্মৃতিতে বঙ্গবন্ধু- মিহির গাঙ্গুলী)।
১৯৭৪ সালের মাঝামাঝি শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধীর আমন্ত্রণে দিল্লী গিয়েছিলেন শেখ মুজিব। নিমাই ভট্টাচার্য এয়ারপোর্টে উপস্থিত ছিলেন এবং সন্ধ্যায় রিপোর্ট করেছিলেন। পরের দিন ফোন এলো রাষ্ট্রপতি ভবন থেকে এখনই শেখ মুজিবের সাথে দেখা করতে হবে। ‘গেলাম, শেখ সাহেবের প্রাইভেট সেক্রেটারি বললেন, আপনার সময় দশ মিনিট। বই দিলাম, তিনি মহাখুশি। তারপর পাশে বসিয়ে বললেন, নিমাই বাবু, আপনি ‘ডিপ্লোমেট’ লিখে সাহিত্যিক হিসেবে একটা ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালন করেছেন। আমি আপনার ‘মেম সাহেব’ আর ‘ডিপ্লোমেট’ পড়ে সত্যি মুগ্ধ। ‘বঙ্গবন্ধু বলতে থাকেন আমি কথা বলি না। উনি বলে যান, আমি মন্ত্রমুগ্ধের মতো ওঁর কথা শুনি…’। উনি একটু থেমে বললেন – রবীন্দ্রনাথ কবে লিখেছেন ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি’ আর কবে আমরা তার মর্ম উপলব্ধি করলাম। (জার্নালিস্টদের জার্নাল-নিমাই ভট্টাচার্য)
বাংলাদেশের স্বাধীনতার পরে জাতীয় সংগীতের সুর ও স্বরলিপি নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছিল। বঙ্গবন্ধু কেবিনেট ডিভিশনের বৈঠকে বলেছিলেন, ‘আমার সোনার বাংলা’ গান আমাদের জাতীয় সংগীত। সুতরাং এই গান সঠিক সুরে গাইতে হবে। শিল্পীদের শান্তি নিকেতনে পাঠিয়ে গানের সঠিক সুর ঠিক করে আনার ব্যবস্থা করুন। সে সময়ে বেতারের কর্মকর্তা ছিলেন রবীন্দ্র সংগীতের শিল্পী আবদুল আহাদ। আবদুল আহাদ তাঁর স্মৃতিচারণে লিখেছেন:‘কেবিনেট সেক্রেটারি তৌফিক ইমাম বললেন, ‘আমার সোনার বাংলা’ গানের স্বরলিপি নিয়ে আসার জন্যে কলকাতা যেতে হবে। আমি, আতিকুল ইসলাম এবং আফসারী খানম কলকাতা গিয়ে কণিকা বন্দ্যোাপাধ্যায়ের সাথে যোগাযোগ করলে তিনি শান্তি নিকেতনে শান্তিদেব ঘোষের সাথে যোগাযোগ করতে বললেন, উনি বিশ্বভারতীর বোর্ডের মেম্বার। শান্তিদেব ঘোষের সাথে দেখা হয়। ‘সোনার বাংলা’ গানটি স্বরলিপির বই’তে যেভাবে ছাপা আছে সেভাবে আমরা গাই না। যে সুর প্রথম খুব সম্ভবত সুচিত্রা, ইন্দিরা দেবীর কাছে থেকে শিখেছিলেন এবং রেকর্ডও করেছিল, আমাদের দরকার সেই সুরে স্বরলিপি। বিশ্বভারতীর বোর্ড স্বরলিপি ছাপিয়ে আমাদের কেবিনেট ডিভিশনে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন।
আবদুল আহাদ শান্তিনিকেতনে প্রবীন্দ্রনাথের জীবদ্দশাতেই শান্তিদেব ঘোষ এর কাছে রবীন্দ্র সঙ্গীত এর তালিম দিয়েছেন এবং গ্রামোফোন কো¤পানীর ট্রেনার হিসাবে কাজ করে তাঁর শিক্ষাগুরু শান্তিদেব ঘোষ, সুচিত্রা মিত্রের মতো শিল্পীরা রবীন্দ্র সঙ্গীত রেকর্ড করেছেন।
পন্ডিত রবি শঙ্কর ১৯৩৩ এ শান্তি নিকেতনে বেড়াতে গেলে তাঁর সাথে দেখা হয়েছিল কবি গুরু রবীন্দ্রনাথের। সে সময় রবি শঙ্কর শুনিয়েছিলেন রক্তে দোলা জাগানো সেই গান, আমার সোনার বাংলা…’।
১৯৭২ সালের ১৪ ডিসেম্বর বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের প্রথম সংবিধানে স্বাক্ষর করেন, ১৬ ডিসেম্বর থেকে সংবিধান কার্যকর হয়।
“সংবিধানের ‘প্রথম ভাগ- প্রজাতন্ত্র’ ধারায় উল্লেখ আছে: জাতীয় সংগীত, পতাকা ও প্রতীক। ৪ (১) প্রজাতন্ত্রের জাতীয় সংগীত ‘আমার সোনার বাংলা’র প্রথম দশ চরণ।”
তথ্যসূত্র:
১. পূর্ববঙ্গ থেকে বাংলাদেশ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও শেখ মুজিবুর রহমান-সেলিনা হোসেন
২. বঙ্গবন্ধুর কলকাতা জয়-জয়দীপ দে
৩. রবীন্দ্র গানের নানা প্রসঙ্গ – রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা
৪. সঙ্গীত মনন- সম্পাদক ইমতিয়াজ আহমেদ
জনপ্রয়
সর্বশেষ
- বেড়া প্রেসক্লাবের আহ্বায়ক কমিটি গঠন সজীব আহ্বায়ক ও গিফারী সদস্য সচিব
- আটঘরিয়ায় নতুন ইউএনও তাহমিদুল ইসলামের দায়িত্ব গ্রহণ
- বিশ^ পরিবেশ দিবস উপলক্ষে বৃক্ষরোপণ ও মানববন্ধন
- উত্তরণ পাবনার ১৯তম বর্ষ পদার্পনে সাংস্কৃতিক উৎসব অনুষ্ঠিত
- জেলা প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির সাবেক সাধারন সম্পাদক মরহুম আব্দুল কাদের মাস্টারের সহধর্মীনির দাফন সম্পন্ন
- সুজানগরে ভাড়ার ভারে যাত্রীরা দিশেহারা
- মায়ের কোল থেকে ছিটকে পড়ে শিশুর মৃত্যু তাকে বাঁচাতে প্রাণ গেলো মোটরসাইকেল আরোহীর
- ১ কেজি গাঁজাসহ মাদক কারবারি আটক
