মোসতাফা সতেজ: অতীতের গৌরব বর্তমানের প্রযুক্তিবিদ্যা ও উজ্জল আগামী এই তিনকাল অনুভব করছেন অমর একুশে প্রস্তক প্রদর্শনীও বইমেলার দর্শককূল। তাদের কাছে এই তিনকাল স্পষ্ট করছে বইপ্রেম। শীতের শেষপক্ষ এবং বসন্তের প্রথমপক্ষ জুড়ে মাসব্যাপী উৎসব আয়োজন করে মহৎ কর্তব্য সম্পান করলো বইমেলা উদযাপন পরিষদ। ব্যবস্থাপনায় অন্নদা গোবিন্দ পাবলিক লাইব্রেরী। লাইব্রেরী ভবনের স্যামসন এইচ চৌধূরী মিলানায়তনে ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহ জুড়ে ছিল পুস্তক প্রদর্শনী। এ পর্বে ছিল হাতে লেখা দুলর্ভ পান্ডুলিপি আর প্রাচীন ও আধুনিক বই। দামের চেয়েও দামী কিছু প্রাচীন ও আধুনিক বই দেখার সৌভাগ্য লাভ করে আগ্রহী দর্শকেরা। বই চেনা ও জানার সুযোগ পেয়ে ভাগ্যবান হয়ে ওঠেন তারা। বই কেনার চেয়ে বই চেনা দরকার আগে। এই উদ্দেশ্যই পুস্তক প্রদর্শনী। যা সুজন সভ্যতাকে উৎসাহিত করে যায়। শিক্ষিত মানুষের ভেতরে বসত করা সাংস্কৃতিক চেতনা উস্কে তোনাই আয়োজকদের লক্ষ্য। আগহীদের জানার পরিধি প্রসারিত করে। জীবন সমৃদ্ধ হয় বই মাহাত্ন্যে। যা ভরসা সঞ্চারকারী।
বীর মুক্তিযোদ্ধা রফিকুল ইসলাম বকুল স্বাধীনতা চত্ত্বরে ক্রেতার সঙ্গে গ্রন্থের আলিঙ্গন ঘটাতেই বইমেলা যেন ঘটকালির ভূমিকা পালন করে যায়। বইমেলা মানে অস্থায়ী ভাবে রাশি রাশি বই প্রদর্শন। বইমেলা মানে চেনা-অচেনা গ্রন্থনাম যুক্ত মনোরঞ্জক প্রচ্ছদ দেখিয়ে দর্শনার্থীদের নজরকাড়া। বইমেলা মানে বই কেনা-বেচারসহ রুচি ষ্নিগ্ধ আমোদ-প্রমোদরে ও রকমারি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। মেধাও মননের আত্নিক সম্মেলন হলো এই মেলা। সেখানে লেখক, শিল্পী, প্রকাশক, বিক্রেতা, ও ক্রেতা সাধারণ পরস্পরের সান্নিধ্যে হয়ে যান একাত্ন। এই চারটি স্তুরকে একই স্থানে মিলিত করে থাকে বইমেলা। যা পরিণত হয় উৎসবে। বইমেলা শুধু মাত্র বই কেনা-বেচা নয়। এর সঙ্গে জড়িতে আছে ঐতিহ্যের উপাদানের আর সংস্কৃতি প্রবহমান ধারা। একটি ভালো বই মেধা ও মননের নিড়ানী। যা সর্বগ্রাসী আঁধার বিনাশী। যে বই পড়ে সে এগিয়ে থাকে। বিনয়ী হয়। যে বই কেনে ও পড়ে সে মহান নির্দেশকের অনুগত হয়। ঘাত-প্রতিঘাতময় জীবসে ভালোলাগা বইই এনে দেয় আপার সান্তনা। জীবন বিকাশে অনেক রকম গ্রন্থ আছে। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে যাদের অনুরাগ আছে।, প্রগাঢ় ভালোবাসা আছে তারা মেলা মাঠে যাচ্ছেন। রুচিশীল গ্রন্থ সংগ্রাহক এবং বিনোদন আহরণকারীও মেলার দর্শক। মেলা মাঠর আকার আয়তন সংক্ষিত হলেও জেলাবাসীকে আপ্লুত করার এই আয়োজন বড়ই চমৎকার। গ্রন্থ বিক্রেতা, প্রকাশক, ক্রেতা আর লেখক থাকে। গতানুগতিক দিন যাপনে মানুষ বিষন্ন হয় যায় কিন্তু উৎসব দিনে কৃষ্টিসম্পন্নদের উষ্ণ সান্নিধ্য পেয়ে হয় আনন্দিত। তাদের উপরতা অনুভব করে নয় প্রফুল্ল। রাজনীতি-সমাজনীতি-গণতন্ত্র-আইন শৃঙ্খলা, হানাহানি সব যেন পড়ে থাকে আড়ালে। কেবল জেগে ওঠে বই প্রসঙ্গ। এছাড়া জীবন অন্ধকারময়। ১৭ টি স্টলে সাজানো রকম রকম বইয়ের দিকে তাকাতে তাকাতে পরিভ্রমণ করে চমৎকার অভিজ্ঞতা হয়। নজরকাড়া প্রচ্ছদ বা বইয়ের নাম সংগ্রহ করা, কেনাতেও এক ধরণের ভালোলাগা অনুভব করা যায় কিনবেন ভেবে পান না। অনেক বইয়ের ভিড়ে কেউ কেউ খেই হারিয়ে এক পর্যায়ে স্থির হন। ব্যক্তিগত ভালো লাগা থেকে প্রছন্দে পৌছান।
মঞ্চে প্রতিদিন রাতে নতুন নতুন আলোচকদের কথা ও বিনোদন অনুষ্ঠান দর্শক-শ্রোতাদের আবিষ্ট করে রাখে। পরিবেশিত নাচ-গান-অভিনয়-আবৃত্তি, বক্তৃতা অনন্দাচ্ছন্ন করে যায়। এই বিনোদনের হাওয়ায় স্থানীয় সংস্কৃতি অনেকখানি বেগবান। সংগঠনগুলো হচ্ছে অনুপ্রাণিত উজ্জীবিত। যা একটি দেশের সামগ্রিক জীবনচর্যার আদর্শ। মানসিক জীবন, কর্মজীবন ব্যক্তি জীবন এবং সামজিক জীবন নিয়েই সংস্কৃতি।
প্রযুক্তি প্রজম্মের কাছেও এমেলা গুরুত্ববাহী। স্বল্প পরিসরের মেলা চত্বরে দলে দলে দর্শক-ক্রেতার হাঁটা চলায় যে টুকু ধূলো ওড়ে তা যেন সংস্কৃতিক রেনু। এই অনুভবময় রেনু গায়ে মেখে বইপ্রেমী মানুষ শামিল হন মঞ্চের সামনে রাখা আসর সারিতে।
পাঠ্যপৃস্তক বাদে অন্যান্য বই পড়াবার মানুষ ক্রমশ দ্বিতীয় কারণ সংরক্ষণের স্থানভাব। আজকাল বিয়ের অনুষ্ঠানসহ সকল অনুষ্ঠানে বই উপহারের চলন ফিকে হয়ে আসছে। পাঠ্যক্রমে এখন যে অনাগ্রহ চলছে তাতে বইয়ের ওপর ছাত্র-ছাত্রীদের আগ্রহ ও ভালোবাসা সৃষ্টি হয়ে তা যেন অকল্পনীয়। পাঠ্য বইই যারা দিয়ে পড়তে চায় না, নোট, সাজেসন্স, কোচিং করে তারা সহজ পথে ডিগ্রি অর্জন করতে চায়। কেরিয়ার মুখী শিক্ষা ব্যবস্থায় পুস্তুকপ্রেম জাগ্রত হবে এ আশা পুরণের সম্ভাবনা ক্ষীণ। ব্যতিক্রমের পাল্লা ভারি করতেই বইমেলা। মেলক থেকে কেনা বইয়ের স্থান হয় ঘরের বুক সেলফে। কতজন তার পাতা ওল্টান তা গবেষণার বিষয়। যাদের বই সংরক্ষণের স্থান নেই তারা যত্রতত্র রাখতে রাখতেই নষ্ট করে ফেলেন। আর্দ্র আবহাওয়ায় বইয়ের আঠায় আর আঠা থাকে না। পাতা খুলে যায়। বইগুলো ডানে-বামের মার্টজস এত কম যে সেলাই করে বাধলে কাটা যায় না। এছাড়াও রয়েছে উপপোশ। ন্যাপথলিন, স্প্রে, নিমপাতা, কীটনাশক ব্যবহার করেও স্থায়ী সমাধান হয় না। স্থান অভাব হলে লাইব্রেরীল অভাব। তাই নতুন করে বই কেনা হচ্ছে না। প্রয়োজন হলে লাইব্রেরীর সাহায্য। বই প্রকাশনার আধুনিক ও উন্নত ব্যবস্থার কথা ভাবতে হবে। বই সংরক্ষণের শ্লোগান প্রচার করে দরকার।
ভোবাবাদী সমাজে জীবনযাত্রা, টেনশন, টিভি চ্যানেলের দৌরাত্ন্য, মোবাইল ইউটিউব পড়ার আগ্রহ কমিয়ে দিচ্ছে। তারপরেও জোর গলায় বলা যায় বইয়ের কোন বিকল্প হয় না।
কৃষ্টিসম্পন্ন পাঠক এনালগ যুগের বিখ্যাত লিখিয়েদের বই বর্জন করেন নি। প্রচার মাধ্যমে অবগত হয়ে ঠিকই সংগ্রহ করছেন। সময় সুযোগ বের করে পড়েও ফেলছেন। থাকছেন এক ধাপ এগিয়ে। খ্যাতিমানদের সৃষ্টির দিকে সেকেলে দৃষ্টিতে তাকাকার দর্শক বাড়লেও ইতিহাস তাদের ছাড়ে না। প্রযুক্তি নির্ভর প্রজম্মের তরুণ-তরুনীরা বিষয় বৈচিত্র্যে বাঁক নিতে নিতে ডিজিটাল পর্নের মধ্যগগনে বিরাজ করছে। শিক্ষার্থী যেমন পরীক্ষার আগে পাঠ্য পুস্তকের মধ্যে ডুবে যায় তেমনি বইমেলাতেও কিছু বিভিন্ন পেশার প্রেমী মানুষ মাস জুড়ে ডুবে থাকেন। তারাও মঞ্চে দাঁড়িয়ে বক্তৃতার মাধমে অনুজদের উৎসাহিত করে যাচ্ছেন। দেড় দশক পরে বর্তমান প্রজন্ম প্রবহমান নদীর মতো বেড়ে ওঠার রঙ ছড়াতে ছড়াতে স্মার্ট যুগে পৌছে যাবে।
মেলার মেয়াদ এসে গেছে শেষ দিকে। আর মাত্র ২দিন। এখন যেন মাধ্যকর্ষণের মতো আকর্ষণ করছে আগ্রহীদের। দশর্ক শ্রোতাদের ঢলে প্লাবিত। ক্রেতার চেয়ে বিনোদনে আগ্রহীদের পদচারণা বেশি। অবশ্য বিক্রিও বাড়ছে। খ্যাতিমানদের বইয়ের পাশাপাশি স্থানীয় কবি-সাহিত্যিকদের বইও বিকোচ্ছে। বই দেখতে দেখতে, পছন্দের বই খুঁজতে খুঁজতে ক্লাতি হলে ভয় নেই। একটুখানি জিরিয়ে নেবার জন্যে আছে চা-নাস্তার দোকান।
মোবাইলে নেটকার্ড ভরেও বর্তমানে প্রজন্ম মনের সম্পূর্ণ তৃষ্ণ মেটাতে অক্ষম। জীবনের উদ্দেশ্য ও দিশা হারিয়ে যারা চূড়ান্ত হতাশার শিকার তারাও মেলায় এসে ডেল কার্ণেগির বইসহ অন্যান্য বই দেখছেন। করে ফেলছেন সংগ্রহ।
এবার বইমেলা (২০২৪) উদ্বোধন করেন শাহাজাদপুরে অবস্থিত রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. শাহ আজম। তিনি ছিলেন প্রধান অতিথি। সম্মানিত অতিথি ছিলেন পাবনা জেলা প্রশাসক মুহা: আসাদুজ্জামান, পুলিশ সুপার আকবর আলী মুনসী ও বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ অধ্যাপক মোহাম্মদ কামরুজ্জামান। সাংস্কৃতিক চেতনা সমৃদ্ধ এ সকল অতিথিদের বুদ্ধিদীপ্ত চেহারটা দেখার সৌভাগ্য হয়। উৎসবের উদ্বোধনী পর্বে উপস্থিত থাকার জন্যে মনোহর পত্র দিয়ে আমন্ত্রাণ জানিয়েছিলেন মেলা উদযাপন পরিষদের সভাপতি শিবজিত নাগ ও অন্নদা গোবিন্দা পাবলিক লাইব্রেরী সভাপতি অঞ্জন চৌধুরী পিন্টু। তারা এই মহৎ আয়োজন করে দর্শক-শ্রোতাদের সমভ্রম লাভ করতে পেরেছেন।
জনপ্রয়
সর্বশেষ
- বেড়া প্রেসক্লাবের আহ্বায়ক কমিটি গঠন সজীব আহ্বায়ক ও গিফারী সদস্য সচিব
- আটঘরিয়ায় নতুন ইউএনও তাহমিদুল ইসলামের দায়িত্ব গ্রহণ
- বিশ^ পরিবেশ দিবস উপলক্ষে বৃক্ষরোপণ ও মানববন্ধন
- উত্তরণ পাবনার ১৯তম বর্ষ পদার্পনে সাংস্কৃতিক উৎসব অনুষ্ঠিত
- জেলা প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির সাবেক সাধারন সম্পাদক মরহুম আব্দুল কাদের মাস্টারের সহধর্মীনির দাফন সম্পন্ন
- সুজানগরে ভাড়ার ভারে যাত্রীরা দিশেহারা
- মায়ের কোল থেকে ছিটকে পড়ে শিশুর মৃত্যু তাকে বাঁচাতে প্রাণ গেলো মোটরসাইকেল আরোহীর
- ১ কেজি গাঁজাসহ মাদক কারবারি আটক
