এস মুস্তাকিম সবুজ: এস এম মহিউদ্দিন আমার পিতা, দক্ষ নাট্য অভিনেতা, নির্দেশক ও নাট্যকার হিসেবে জেলাজুড়ে সুখ্যাতি ছিলো তার। পাবনার সাংস্কৃতিক অঙ্গনের এক সময়েরে প্রাণপুরুষ ছিলেন তিনি। তার অভিনয়ের দক্ষতায় মুগ্ধ হতো দর্শক। জেলার সাংস্কৃতিক সংগঠন ও নাট্য সংগঠনের কর্মীদের সাথে ছিলো তার আত্মিক এক সম্পর্ক। ১৯২০ সালের ৩১ জানুয়ারি বৃহত্তর পাবনা বর্তমান সিরাজগঞ্জ এর রূপবাটি ইউনিয়নের শিলাচাপরি গ্রামে জন্ম গ্রহন করেন তিনি। তার পিতা মিনহাজ উদ্দিন সরকার, বর্তমান সিরাজগঞ্জের রূপবাটি ইউনিয়নের আনুমানিক ৩০ বছরের মতো চেয়ারম্যান ছিলেন। বামনদি নামক গ্রামে আমাদের পূর্ব পুরুষদের আবাসস্থল ছিল এবং পদবী ছিল খাঁন (অর্থাৎ ঈসা খাঁর বংশধর)। বামনদি গ্রাম থেকে তরফ খাঁ এসে ঠাকুর পরিবারের নায়েব এর চাকুরী নেয় এবং এই ঠাকুর বংশ তাকে সরকার উপাধি দেয়। তরফ সরকারের বৃদ্ধা অবস্থায় তার ছেলে মিনহাজ উদ্দিন সরকার নায়েবী গ্রহন করেন। দুই স্ত্রী ছিল, পাঁচ ভাই, ছয় বোন। আমার পিতা এস এম মহিউদ্দিনের পড়ালেখা শুরু হয় বেড়ার একটি স্কুলে। ছেটো বেলা থেকেই তিনি ছিলেন সাংস্কৃতি মনা। গ্রামে প্রভাব বিস্তার নিয়ে পক্ষ বিপক্ষ জমি বা চর এলাকা নিয়ে মাঝে মধ্যেই বিবাদ (কাইজ্যে) হতো সেই কারনে দাদা আব্বাকে পাবনায় লেখা পড়ার জন্য পাঠিয়ে দেন। তার বড় বোন পাবনার এক সময়ের বিশিষ্টজন মহসিন মুক্তারের সাথে বিবাহ সূত্রে আবদ্ধে হন। সেই কারনে আব্বার বড় দুলাভাই ছিলেন মহসিন মুক্তার, তার বড় ছেলে মুসা মুক্তার (জুবিলী ট্যাংক পাড়ায়)। আব্বা গ্রাম থেকে এসে লেখাপড়া শুরু করেন পাবনা শহরে। কৃতিত্বের সাথে মেট্রিকুলেশন পাস করার পর (ব্রিটিশ শাসনের সময়) কলকাতায় সিভিল সাপ্লাই খাদ্য মন্ত্রনালয়ে চাকরি নিয়ে চলে যান, কলকাতা থাকা কালিন সময়ে নাট্য জগতের পুরোধা নাট্যচার্য শিশির ভাদুরী ও সহিন্দ্র চৌধুরী প্রমুখের মঞ্চ নাটক দেখে নাটকের প্রতি আগ্রহ সৃষ্টি হয় তার ও নাটকে অভিনয় শুরু করেন তিনি। ১৯৪৭ সালে (উনার মুখে শুনা) দেশ ভাগের সময় হিন্দু মুসলিম দাঙ্গা চলাকালীন সময়ে ফের পাবনাতে চলে আসেন। বর্ডার পার হওয়ার ব্যাপারে বলেছিলেন, এক হিন্দু স্কুটার ড্রাইভার গাড়ির মধ্যে ছালা চাঁটাই দিয়ে ঢেকে তাকে বর্ডার পার করে দিয়েছলেন। তিনি পূর্ব পাকিস্থান ডাক বিভাগে চাকরি নেন। ডাক বিভাগের আর. এম. এস. অফিসে সিরাজগঞ্জ, ইশ^রদী, কুষ্টিয়া এবং খুলনাতে চাকরি করেন। পাবনা শহরের রাধানগর পাওয়ার হাউজ পাড়ার মরহুম ওসমান গনি সাহেবের বড় মেয়ে আফরোজা বেগম শেফালীর সাথে এস এম মহিউদ্দিন এর বিবাহ দেন। বদলী সংক্রান্ত চাকরির জন্য আমার নানা ওসমান গনি পাবনা রাধানগর পাওয়ার হাউজ পাড়াতে, মা সহ আমাদের দুই ভাই দুই বোনকে নানা নিজ বাড়িতে রেখে দেন। আমরা দুই ভাই ও দুই বোন, বড় বোন গৃহিণী, বড় ভাই গ্লাসকো ঔষধ কোম্পানিতে এরিয়া এক্সিকিউটিভ হয়ে অবসর নেন। তিনি বর্তমানে ঢাকার গুলশানে একটি স্বনামেখ্যাত হোটেলে কর্মরত আছেন, আর আমি পাবনাতে ক্রীড়া ও বিভিন্ন সামাজিক সংস্থার সাথে এবং ঢাকা কমিউনিটি হাসপাতাল ট্রাস্ট এর পাবনায় একটি সংস্থার পরিচালক হিসাবে দায়িত্ব পালন করছি। ছোট বোন বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর চাকরি থেকে গত বছর অবসর নিয়েছে ও বর্তমানে ঢাকাতে অবস্থান করছে। আমার আব্বা এস এম মহিউদ্দিন যখন মঞ্চ নাটক করতেন তার সময়ে পাথরতলার পরিমল কাকু, রাধানগর পেট্রোলিয়াম এজেন্সির (আলিয়া মাদ্রাসা সংলগ্ন) সাবেক কেলটেক্স কোম্পানির হিরু ও পদ্মসাহার বড় ভায়ের (নাম মনে নাই) কথা শুধু মনে আছে তারা ছিলেন। আব্বা পাবনাতে আসলে সোনাপট্টিতে ধিরেনের চা স্টলে বসতেন। সেখানে পাবনার নাট্য জগতের প্রায় সকলেই ওখানে সন্ধ্যার পর আড্ডা দিতেন, আমিও মাঝে মাঝে আব্বার সাথে যেতাম। পাবনা বনমালী ইন্সটিটিউটে (বর্তমান বনমালী শিল্পকলা কেন্দ্র) মায়ের সাথে পরিবারের সকলে মিলে যেতাম আব্বার অভিনীত নাটক দেখতে। সেই সময়ে দেখেছি আব্বার বড় ভাগিনা মুসা মুক্তার সাদা হাফপ্যান্ট ও শার্ট পড়ে মঞ্চ তদারকি করতেন। আব্বার মুখে শুনেছিলাম কুষ্টিয়া যখন ছিলেন স্বাধীনত্তোর কালে বাংলাদেশের প্রখ্যাত খলনায়ক মরহুম রাজু আহম্মেদ বাবাকে ওস্তাদ বলে ডাকতেন। খুলনা থাকাকালীন রক্সি হলে মঞ্চ নাটক হতো, সেই সময়ে দুই দিনব্যাপী নাটকে বাংলাদেশের সিরাজদ্দৌলা খ্যাত আনোয়ার হোসেন একদিন সিরাজদ্দৌলার ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন, আর আব্বা পরের দিন টিপু সুলতান নাটকে টিপু সুলতানের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছিলেন, আনোয়ার হোসেন চাকরি জীবনে আব্বার অভিনয় এবং একনাগারে সংলাপ ও গলার ভয়েজ শুনে অভিনন্দন জানিয়েছিলেন এবং ঢাকাতে যেতে আহবান করেছিলেন। আব্বা ষাটের দশকে চাঁদ আলী মিয়ার প্রযোজনায় “কার বউ’ সিনেমায় ছোট্ট একটি চরিত্রে অভিনয়ের সুযোগ পেয়েছিলেন, আমরা পরিবারসহ সেই ছবি দেখেছিলাম। উনার অভিনীত সেই দৃশ্যের কথা এখনো মনে আছে। সরকারি চাকরির কারণে সিনেমা জগতে যাওয়ার সম্ভব হয়নি তার। আব্বা ফারুক শিয়রের” সামনের পৃথিবীর” নাটকের খল চরিত্রে দবির হাজির ভুমিকায় অভিনয় করতেন। আশির দশকে পাবনাতে অনেক নাট্য সংগঠন গড়ে উঠেছিল, সেই সময়ে পাবনা পাওয়ার হাউজের পিছনে বড় মাঠে “একক সংঘের” উদ্যোগে এবং পৃষ্ঠপোষকতায় প্রতি বছর মঞ্চ নাটক ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হতো। ওই মঞ্চে আব্বা ফারুক সিয়রের লেখা সামনের পৃথিবীর খল চরিত্র দবির হাজী ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন। উনি জীবিত কালে বেশ কয়টি নাটকের বই লিখেছেন, “বাসর ঘড়” আবোল তাবোল, আরও অনেক হাতে লেখা পান্ডুলিপি সংরক্ষিত আছে। “বাসর ঘর” বইটি প্রকাশিত হয়েছিলো সম্ভবত আর্থিক কারণে অনেক বই প্রকাশ করতে পারেননি তিনি। একক সংঘের মঞ্চে উনার আবোল তাবোল নাটকটি মঞ্চস্থ হয়েছিলো। এই মঞ্চে বর্তমান সময়ের নাট্য ব্যক্তিত্ব অ্যাডভোকেট আব্দুল হান্নান শেলিও অভিনয় করেছিলেন। বর্তমান সময়ে টেলিভিশন নাট্য শিল্পী দীর্ঘ দেহি পাবনার মাসুদ রানা মিঠু রাধানগর বটতলা বাজারে আমার সাথে পরিচয় কালে বলেছিলেন মহিউদ্দিন স্যার আমার নাট্য শিক্ষক। খুলনা এক অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের বিশিষ্ট কবি জসিম উদ্দিন সাহেব প্রধান অতিথি ছিলেন ছিলেন, আব্বা একটি বাচ্চা ছেলেকে নাতি সাজিয়ে কবি জসীমউদ্দীন এর” কবর” কবিতাটি আবৃত্তি করেছিলেন, কবি জসীমউদ্দীন আবৃত্তি শুনে বলেছিলেন মহিউদ্দিনের কন্ঠে ও অভিনয় দেখে বলেছিলেন আমার কবিতা লেখাটি আজ মন হচ্ছে স্বার্থক হয়েছে। অবসরের পর আব্বা পাবনা শিশু একাডেমীতে এনামুল হক খান মজলিস শিশু কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্বে থাকাকালীন শিশু একাডেমির নাটক ও আবৃত্তি প্রশিক্ষক ছিলেন। কিন্তু কোনো কারন ছাড়াই হঠাৎ করেই তাকে সেখান থেকে বাদ দেওয়া হয় এবং বলা হযেছিলো মহিউদ্দিন সাহেব আমরা নতুন একজন প্রশিক্ষক নিয়েছি, কাল থেকে আপনার আর আসার প্রয়োজন নেই। এতে উনি অনেক কষ্ট পেয়েছিলেন। জেলার ঐতিহ্যবাহী নাট্য সংগঠন পাবনা থিয়েটার-৭৭ এর উদ্যোগে ১৯৮৮ সালে আমার আব্বা এস এম মহিউদ্দিনকে সংবর্ধনা প্রদান করা হয়। এ অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি দেশবরেণ্য নাট্য অভিনেতা মাসুম আজিজ আব্বার হাতে সম্মাননা ক্রেষ্ট তুলে দেন। আর এ অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন জনপ্রিয় নাট্য অভিনেতা আজিজুল হাকিম। আমার অত্যন্ত স্নেহের ছোটো ভাই, পরপর দুবার এফপিএবির জাতীয় পুরস্কারসহ নানা পুরস্কারে ভূষিত বিশিষ্ট সাংবাদিক ও কবি, বৃহত্তর পাবনার প্রথম প্রকাশিত দৈনিক ইছামতির প্রধান প্রতিবেদক ছিফাত রহমান সনম তার লেখা একটি কবিতার বইতে জেলার সোনালী অতীতের কিছু নাট্যজনদের নিয়ে একটি অনেক সুন্দর কবিতা লিখেছিলো, সেখানেও উল্লেখ করা হয়েছিলো আমার আব্বা এস এম মহিউদ্দিনের নাম। ২০১০ সালের ১৫ জানুয়ারী আব্বা হঠাৎ করে আমাকে বললেন আমার ছুটি শেষ হয়ে গেছে, আমি চাকরিতে জয়েন করব এবং সেই দিন থেকে অসংলগ্ন ভাবে কথাবার্তা বলতে লাগলেন, চাকরিতে থাকাকালী রেলওয়ে ও পোস্ট অফিসে অনেক বিহারী চাকরি করতেন, তাদের সাথে আব্বার ওঠাবসা ছিলো, যে কারণে তিনি উর্দুতে কথাবার্তা বলা শুরু করলেন, আমি পরিচিত ডাক্তারের সাথে আলাপ করলে তিনি বাসায় এসে আব্বাকে দেখেন বললেন তার ব্রেইন স্ট্রোক করেছে। ১৭ জানুয়ারী উনি ঘুম থেকে আর উঠলেন না সম্পূর্ণ অচেতন হয়ে পড়লেন, চিকিৎসকের পরামর্শে পাবনা জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করলাম তারপর জ্ঞান ফিরলো, চিকিৎসক আব্বাকে বাসায় নিয়ে যেতে বললেন। ১৯ জানুয়ারী আবার অচেতন হয়ে গেলেন আব্বা, শুধু নিঃশ^াস আর পাল্স চলছিল, আমি ঢাকা নিয়ে যাবার জন্য চিকিৎসককে বললে তিনি বললেন আব্বার শারিরিক পরিস্থিতি ভালো নয়, ফলে এই মুহুর্তে আব্বাকে ঢাকাতে স্থানান্তর করা ঠিক হবে না। ধীরে ধীরে উনি আরো খারাপের দিকে চলে গেলেন। প্রচন্ড শীতের মাঝে ২০১০ সালের ২২ জানুয়ারি রাত সাড়ে নয়টায় আমাদেরকে এতিম করে চলে গেলেন আমার আত্মার স্পন্দনের শব্দ, আমার পৃথিবীর সবচেয়ে প্রিয়মুখ আমার আব্বা এস এম মহিউদ্দিন। আমরা হারালাম আমাদের পিতাকে, পাবনা জেলা হারালো একজন জনপ্রিয় দর্শকমুগ্ধ নাট্যজনকে। আজকে আব্বার ১৪ তম মৃত্যুবার্ষিক, সকল পরিচিতজন ও শুভানুধ্যায়ীদের কাছে আমার আব্বার জন্য দোয়া প্রার্থনা করছি। আল্লাহপাক আমাদের সকলকে ভালো রাখুন। (লেখক- সহ সভাপতি, পাবনা জেলা ক্রীড়া সংস্থা, সভাপতি আদর্শ বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়)
সর্বশেষ
- বেড়া প্রেসক্লাবের আহ্বায়ক কমিটি গঠন সজীব আহ্বায়ক ও গিফারী সদস্য সচিব
- আটঘরিয়ায় নতুন ইউএনও তাহমিদুল ইসলামের দায়িত্ব গ্রহণ
- বিশ^ পরিবেশ দিবস উপলক্ষে বৃক্ষরোপণ ও মানববন্ধন
- উত্তরণ পাবনার ১৯তম বর্ষ পদার্পনে সাংস্কৃতিক উৎসব অনুষ্ঠিত
- জেলা প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির সাবেক সাধারন সম্পাদক মরহুম আব্দুল কাদের মাস্টারের সহধর্মীনির দাফন সম্পন্ন
- সুজানগরে ভাড়ার ভারে যাত্রীরা দিশেহারা
- মায়ের কোল থেকে ছিটকে পড়ে শিশুর মৃত্যু তাকে বাঁচাতে প্রাণ গেলো মোটরসাইকেল আরোহীর
- ১ কেজি গাঁজাসহ মাদক কারবারি আটক
